প্রতিবন্ধীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নয়

অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। উন্নতি হচ্ছে আমাদের জীবনযাত্রার মান, কিন্তু তেমন উন্নতি হয়নি আমাদের চিন্তা-ভাবনার। আমাদের সমাজে এখনও প্রতিবন্ধী শব্দটি অনেকটা নেতিবাচক অর্থেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রতিবন্ধী বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি তা হলো এমন এক ব্যক্তি যার হাত নেই বা পা নেই অথবা হাত-পা কোনোটিই নেই, কানে কম শোনে বা শোনেই না, কথা বলতে পারে না আর পারলেও তা আমাদের কাছে অর্থহীন, চোখে দেখে না, একজন স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় কম বুদ্ধিসম্পন্ন এবং কিছুটা অস্বাভাবিক। আমরা কি কখনো আমাদের চারপাশে থাকা এসব মানুষদের কথা ভেবেছি। প্রায়ই দেখছি, ভাবিনি কখনো।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। আমাদের চারপাশেই আমাদের আপনজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশীদের মাঝেও রয়েছে অনেক প্রতিবন্ধী। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১০% বা প্রায় ১৬ মিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ১.৪% বা প্রায় ২০ লক্ষ ৬০ হাজার ৬১২ জন প্রতিবন্ধী রয়েছে বাংলাদেশে। এছাড়া প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোও এর সম্ভাব্য সংখ্যা নির্ধারণের চেষ্টা করেছে। যেমন, প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির মতে ৭.৮%, অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ-এর মতে ৮.৮% জনসংখ্যা প্রতিবন্ধী।

সব মিলিয়ে আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা কম নয়। প্রতিবন্ধীরা আমাদেরই অংশ। তারাও আমাদের মতোই মানুষ। তাদেরও মাঝে রয়েছে আবেগ, অনুভূতি বা ভালোবাসার অস্তিত্ব। কিন্তু আমরা তাদের আবেগ, অনুভূতি বা ভালোবাসাকে বুঝি না, মূল্য দেই না। কখনো বুঝার চেষ্টাও করি না। আমরা কখনোই এদের অব্যক্ত কথাগুলো শুনতে চাই না। এদের জীবনযাত্রা যে কতোটা কষ্টের সেটা নিয়েও ভাবি না। এরা যে কতোটা অসহায় জীবনযাপন করে সেটা ভাবার আমাদের সময় আছে কি! কারোর নেই। একজন বাবা-মায়ের কাছে একজন প্রতিবন্ধী শিশু যে কতোটা কষ্টের, কতোটা বেদনার তা কেবল বাবা-মাই বুঝতে পারে।

আমাদের সমাজে অনেকেই প্রতিবন্ধী সন্তানকে মা-বাবার পাপকর্মের ফল হিসেবে মনে করে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এধরনের কুসংস্কার খুবই বেশি। এখনও প্রতিবন্ধীকে পরিবার বা সমাজের বোঝা হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে। অন্যের উপর নির্ভরশীল হিসেবেই দেখা হয়। যেখানে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে আমরা এখনো ভুল ধারণা, কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরে আছি। এমনটা ঠিক নয়। এদেরকে ভালোবাসুন, এদেরকেও  একটু সুযোগ দিন, সহযোগিতা করুন। আপনার-আমার ভালোবাসা এবং সুযোগ পেলে এরাও আর পাঁচটা স্বাভাবিক মানুষের মতো বাঁচতে পারবে। তাই এদের ভালোবাসুন, অবহেলা নয়। আপনার কিছুটা সময় আর প্রচেষ্টার মাধ্যমে আপনি এদের জীবনের গুণমানকে আরও উন্নত করতে পারবেন।

আপনি হয়তো ভাবছেন ওরা তো প্রতিবন্ধী। ওরা আবার কাজ করবে কিভাবে! আমাদের অন্তরের উপলব্ধির বড়ই অভাব। আসলে ওদের পাশাপাশি আমাদের মনগুলোও আজকাল প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে। সবসময় নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা নিয়েই আমরা মশগুল। মনের সংকীর্ণতাকে মুছে ফেলে এদেরকেও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া উচিত। দেখবেন তাদের উপযোগী পরিবেশে তারা একজন স্বাভাবিক মানুষের থেকে কম কাজ করবে না। অনেক সম্ভাবনা আছে তাদের মাঝে। যদি তাদের যথাযথ কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারি তাহলে তারা পরিবার, সমাজ বা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। তাদের পেছনে আর আমাদের অর্থ ব্যয় করতে হবে না। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিলে তাদের যেমন আত্মমর্যাদা বাড়বে তেমন আমাদের দেশের মাথাপিছু আয়ও বাড়বে। দেশের ১০% পিছিয়ে পড়া মানুষের কিছু অংশও যদি কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় তবে সেটা অবশ্যই আমাদের দেশের বেকারত্বের যেমন কমতে সাহায্য করবে তেমনি নির্ভরশীলতার হারও কমবে কিছুটা।

আসুন, আমরা আমাদের মনের নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনার দেয়ালকে ভেঙে দিয়ে তাদের উপযোগী কর্মমুখী শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেই। দেশ বা সমাজের বোঝা নামক অপবাদ থেকে আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মানুষদের মুক্ত করি। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়ে দেশের উন্নয়নের গতিকে আরো ত্বরান্বিত করি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়