কলকাতায় চলছে দুরবস্থা

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

কথায় আছে ‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ’। গত ১৫ দিন ধরে সারা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অচলাবস্থার জন্য পর্যটনশিল্পে কার্যত ধস নেমেছে। বড়দিন ও নতুন বছরের ছুটিতে বেড়ানোর অভ্যাস শুধু বাঙালিদের মধ্যেই নয়, এই অভ্যাস সমস্ত ভারতবাসীর। এবারই সম্ভবত প্রথম এই ছুটি উপভোগ করতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এমনকি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ভাগে অনিয়মিত ট্রেন চলাচলের কারণে দার্জিলিং, আলিপুর দুয়ার, কুচবিহার বা জলপাইগুড়ি এলাকার দুই-তিন মাস আগে অগ্রিম টিকিট কেটেও পর্যটকেরা সেখানে যেতে আর সাহস পাচ্ছে না।

কলকাতায় প্রায় ৩০০ ট্যুর অপারেটর কোম্পানি আছে। তাদের মাথায় হাত। ট্রেন ছাড়া এবং হোটেল বুকিংয়ের জন্য তারা লাখ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়েছেন। সেই টাকা এখন তাদের ফেরত দিতে হবে। কোথা থেকে তারা টাকা দেবেন? কারণ অগ্রিম বুকিংয়ের টাকা তো তারা ইতোমধ্যে হোটেল বুকিংয়ে দিয়ে রেখেছেন। বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলাম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দপ্তরের সচিবের সঙ্গে। তার মতে, আমরা নিরুপায়। দার্জিলিংয়ের জেলাশাসক তাকে জানিয়েছেন, হোটেলগুলো খাঁ-খাঁ করছে। শিলিগুড়ি যেতে দার্জিলিং জেলার কার্শিয়াং, শিলং ও কালিম্পংয়ে যাওয়ার রাস্তা অবরুদ্ধ। দার্জিলিংয়ের স্কুলগুলোতে খ্রিস্টমাস ও নতুন বচরের ছুটি পড়ে গেছে, কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা হোস্টেলেই আটকে আছে। পর্যটকেরাও আটকে আছে। এমনকি কলকাতা থেকে মাত্র ১০০ মাইল দূরে দীঘার সমুদ্রপাড়ে লোকজনের ভিড় নেই। দীঘার হোটেল ব্যবসায়ী সমিতি ও দীঘা উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুধাংশু দে বলেন, এবারে অর্থাত্ এই ছুটির মৌসুমে যে মন্দা দেখা গেছে, সেই জন্য হোটেলে লোকজনের ভিড় নেই। সবাই বুকিং বাতিল করে দিচ্ছে। এমনকি গোটা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিতরতার জন্য পর্যটকেরা আসতে সাহস পাচ্ছেন না। পশ্চিমবঙ্গ সরকার উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা আরো ভালো করার জন্য অনেকগুলো বাস চালু করেছে, কিন্তু সেই বাসগুলোতেও লোকসংখ্যা নগণ্য।

আগস্ট মাসের ৫ তারিখ থেকে কাশ্মীরে নেট ও মোবাইল সার্ভিস বন্ধ থাকার কারণে কাশ্মীরে পর্যটক নেই বললেই চলে। শ্রীনগরের গল লেক কার্যত জনমানবশূন্য। শিকারার ব্যবসায়ীরা কশ্মীরের বরফের মতোই উত্তাপহীন এবং বিষাদগ্রস্ত হয়ে দিন গুনছেন পর্যটকদের আশায়। বরাবরের মতো এবারও বেশ কিছু শালবিক্রেতা কলকাতায় এসেছে। তাদের বক্তব্য হলো, শ্রীনগর থেকে পাঠানকোট আসতে স্বাভাবিক সময়ে ছয়-সাত ঘণ্টা লাগত, কিন্তু এবার তারা বহু কষ্টে পাঁচ-ছয় দিন ধরে পাঠানকোটে পৌঁছে সেখান থেকে ট্রেনে করে কলকাতায় পৌঁছেনে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কলকাতায় শীতকালে শাল বিক্রি করাই তাদের সারা বছরের রুটিরোজগার। তাদের ঝুঁকি নিয়েই আসতে হয়েছে। ছুটি কাটাতে বাঙালিদের বড় একটা পর্যটনকেন্দ্র ছিল শ্রীনগর ও তার আশপাশের এলাকা। কাশ্মীর থেকে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা মোদি সরকার প্রত্যাহার করার পর থেকেই বাঙালিরা এবার আর কাশ্মীরমুখী হয়নি। সিমলা, দেরাদুন, ঋষিকেশ লছমনকোলা ইত্যাদি পর্যটনকেন্দ্র ছুটি কাটাতে যাওয়ার একটা আদর্শ জায়গা ছিল। এবার সেখানেও একই অবস্থা। কলকাতায় প্রায় ৩০০-৩৫০টি ট্যুর অপারেটর সংস্থা আছে। এদের একটা অ্যাসোসিয়েশনও আছে। অ্যাসোশিয়শনের কর্তা দীনেশ কুন্ডুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি হতাশার সঙ্গে বলেন, ‘দুই পুরুষ ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছি। এ বছরের মতো আগে কখনো আমরা এভাবে আর্থিক দিক থেকে মার খাইনি। যারা বুকিংয়ের টাকা দিয়েছিল, তারা সেই টাকা ফেরত চাইছে। না দিতে পারলে অফিস ভাঙচুর করছে। এমনকি কলকাতা থেকে ৫০ মাইল দূরে বকখালী ও সুন্দরবন এলাকায় লোক যেতে চাইছে না। ভয় একটাই, যদি যাতায়াতের পথে কোনো বাধার সৃষ্টি হয়!

বেসরকারি সূত্রে বলা হয়, এই পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েক হাজার যুবক-যুবতি বেকার হয়ে গেল। এই বেকারদের নতুন কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা কীভাবে হবে, তাই ভেবে ট্যুরিস্ট কোম্পানিগুলোর মালিকদের মাথায় হাত। পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত বাস চালু করলেও জাতীয় সড়কগুলোর হাল খুব খারাপ। স্বাভাবিক অবস্থায় কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গে যেতে ১০-১২ ঘণ্টা লাগত, এখন লাগছে ১৫-২০ ঘণ্টা। বয়স্ক ও বাচ্চাদের অনেকেই এই ভাঙা রাস্তা দিয়ে যাতায়ত করতে চাইছে না।

দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র উপায় হলো রেল ও বিমান। অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা, কেরল, কর্ণাটক প্রভৃতি রাজ্যে দক্ষিণ-পূর্ব রেলের যোগাযোগ প্রাায় বিচ্ছিন্ন। বিমান ভাড়াও খুব বেশি। তাই শুধু পর্যটকই নয়, যারা দক্ষিণে বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিত্সার জন্য যেতে বাধ্য হয়, তারাও এখন মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন। এর মূল কারণের গভীরে গেলে দেখা যাচ্ছে, নাগরিকপুঞ্জ আইন ও নাগরিক সংশোধনী বিলের প্রতিবাদে সারা দেশের ২৭টি রাজ্যে আন্দোলন ও প্রতিবাদের জন্যই এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী গত রবিবার দিল্লিতে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বলেছেন, নাগরিকপুঞ্জ আইন এখনই চালু হচ্ছে না। তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, এ ব্যাপারে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, এই আইন শিগিগর চালু করা হবে। তবে কোনটা সত্য? এজন্য সারাদেশে পর্যটন শিল্প সংস্থাগুলো থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত একটা ধোঁয়াশায় পড়েছে।

বছর দেড়েক আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, চাকরি যখন নেই, তখন পশ্চিমবঙ্গের যুবকেরা তেলেভাজার দোকান খুলছে না, চপশিল্প একটা বড় শিল্প হতে পারে। এটা দিদির বক্তব্য। বৃহত্তর কলকাতায় কয়েক হাজার তেলেভাজার দোকান ছিল। পিঁয়াজু ছাড়া তেলেভাজার দোকান হয় না। পেয়াজের ঊর্ধ্বগামী দামের জন্য এই শিল্পও কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। এমনকি পাঁচতারা হোটেলেও সালাদের ডিশে পেঁয়াজের দেখা নেই। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বাংলাদেশের বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তর ফোর্ট উইলিয়ামে এসেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ৩০-৪০ জন স্বাধীনতাসংগ্রামী। সমর সংবাদদাতা হিসেবে আমি এবং আর একজন আমন্ত্রিত ছিলাম। সেখানেও দেখলাম, ভালো ভালো খাবারের সঙ্গে যে সালাদের প্লেট দেওয়া হয়েছিল, সেখানে পেঁয়াজ নেই। এ নিয়ে আমরা সেদিন খুব হাসাহাসি করেছিলাম। পেঁয়াজের ঢেউ লেগেছে শীতকালীন অন্যান্য ফসলেও। বিশেষ করে কলকাতায় কোনো বাজারে ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। এই শীতের মৌসুমে সব রকম নিত্যদিনের খাবারের দাম সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাঙালির ভ্রমণপিপাসু মন আজ বাধাগ্রস্ত। আগে দেখা যেত খ্রিস্টমাসের ১৫ দিন আগে থাকতেই পার্ক স্ট্রিট এলাকায় খ্রিস্টমাস ট্রি কিনতে কচিকাঁচা থেকে বুড়োদের ভিড়ও থাকত। কিন্তু এবার চিত্রটা বদলে গেছে। সেই উল্লাস আর নেই। এর কারণ হলো নাগরিকপঞ্জি। সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ বাসা বেঁধেছে। বসবাসের চিন্তায় তারা উল্লাস ভুলে গেছে। এছাড়া প্রীবণ সাংবিকদের আড্ডাতেও একই প্রশ্ন আমাকে করছে—কিরে কবে দেশে ফিরে যাচ্ছিস? আর খ্রিস্টমাস কেকের মূল্য আগুনের মতো। সব মিলিয়ে ২০১৯ যেন বলছে, চিন্তা কারো না, সব ফিনিশ। এবার অপেক্ষা ২০২০ সালের। দেখা যাক কী হয়।

n লেখক :ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক