ব্র্যান্ডিংয়ে পিছিয়ে কেন বাংলাদেশ?

জয়া ফারহানা

উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম, যেদিকে তাকাই শুধু ইমারত আর ইমারত। এরই ফাঁকে এক চিলতে ঘাসের ওপর যখন দু-একটা কাশফুল মাথা চাড়া দেয় তখনই ছুটির জন্য ছটফটিয়ে ওঠে পরিযায়ী মন। ছুটির মাহাত্ম্য নেই কার কাছে? নিতান্ত অলস ঘরকুনো, বোহেমিয়ান, ওয়ার্কহোলিক সবার কাছেই ছুটি শব্দটি সমান প্রিয়। তবে সবার ছুটি উপভোগের সুযোগ সমান নয়। চিত্তে ভ্রমণপ্রেমের সঙ্গে বিত্ত সায় দিলেই না গরমে লেকে নৌকা বিহার, মাছ শিকার, স্কুবা ডাইভিং, অবিশ্রান্ত তুষারপাতের মধ্যে বরফের বল ছোড়াছুড়ি, পাহাড়ের ওপর হেলিকপ্টার ট্যুর, মরুভূমির বালিয়াড়িতে ঘোড়ায় চড়ার আনন্দ নেওয়া সম্ভব। প্যারাগ্লাইডার, প্যারাট্রুপার, সি ট্র্যাক, আকাশ, পাহাড়, পাতাল, সুমেরু থেকে কুমেরু সবই সুলভ তখন, সব বাহনই সাধ্যের মুঠোয়। মন চাইলে এহেন ট্যুরিস্ট ছুটে যেতে পারেন উত্তর আমেরিকার সর্ব উত্তরের বরফে মোড়া আলাস্কা কিংবা ধু ধু মরুভূমির দুবাই... আসমুদ্র হিমাচল। ডিসেম্বরের শুরুতে পৃথিবীর যে অংশে তুষার পড়তে শুরু করে, তাপমাত্রা মাইনাসে ঘোরাফেরা করে, নদী খাল লেক জলপ্রপাত জমে যায়, সেখানেও পেশাদার পর্যটক স্কিইং, স্কেটিংয়ের জন্য ছুটে যান, ছুটে যান বরফ উত্সব দেখতে আবার জৈষ্ঠ্য মাসের ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রার আগ্রায় ছুটে যান তাজমহল দেখতে। পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র থেকে শুরু করে বার হপিং নাইট বিচ, ক্যাসিনো কী নেই তাদের পছন্দের তালিকায়? কারো পছন্দ টিলা বা পাহাড়ের ওপর আদিবাসীদের তৈরি বাঁশ কাঠের কটেজ। ভাইকিংদের মতো বিপজ্জনক জলদস্যুদের জীবনযাপনও এদের টানে। তা দেখতে ছুটে যান অসলোর মিউজিয়ামে। নরওয়ে তো তবু সুগম জনপদ। অদেখা জনপদের অচেনা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন দেখতে কত দুর্গম পথ যে পাড়ি দিতে পারেন এরা। শুনেছি, সিকিমের গ্যাংটক মিউজিয়ামে রাখা আছে মানুষের জঙ্ঘার হাড় দিয়ে তৈরি তান্ত্রিক বাঁশি। তা দেখতেও নাকি প্রতিদিন হাজার হাজার ট্যুরিস্টের ভিড়। পেশাদার ভ্রমণপ্রেমীদের এমন বিচিত্র সব আগ্রহকে পুঁজি করে পৃথিবীর কত দেশ পর্যটন খাত থেকে আয় করে নিচ্ছে কত শতকোটি বিলিয়ন ডলার। হংকং এবং সিঙ্গাপুরের আয়ের সবচেয়ে বড়ো খাত পর্যটন। পর্যটকদের মনোযোগ কাড়তে হংকং নিজেকে সাজিয়েছে সাবেক ব্রিটেন এবং আধুনিক চীনের সমন্বয়ে। হয়তো বলবেন, হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো জেল্লাদার ব্র্যান্ডখচিত রিসোর্ট হোটেল মোটেল আমাদের কই? প্রকৃতপক্ষে পর্যটকদের মনঃস্তত্ত্বের বৈচিত্র্যের কোনো শেষ নেই। জিম, সুইমিং পুল, টেনিস কোর্টওয়ালা পাঁচ তারকা হোটেল যেমন কোনো পর্যটকের দরকার তেমন কোনো পর্যটকের আবার দরকার একদম নিরিবিলি নারিকেল গাছের নিচে কুঁড়েঘর। সিঁথির মতো চিরে যাওয়া এক চিলতে মেঠো পথের পাশে সাধারণ কোনো নদী, যার তীরে উড়ে বেড়ায় তুচ্ছ জলফড়িং আর প্রজাপতির দল; তেমন কোনো প্রান্তবর্তী গ্রামে যেতে চান, এমন পর্যটকও রয়েছে বিস্তর। কিন্তু তেমন নিভৃতচারী পর্যটককেও আমরা টানতে পারিনি। নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখার জন্য যে ট্যুরিস্টের কানাডা যাওয়ার পয়সা নেই তাকে আমাদের মাধবকুণ্ডর জলপ্রপাত দেখানোর কী ব্যবস্থা করতে পেরেছি আমরা? পাশের ভারতের দিকে তাকান। বরফের চাদরে মোড়া রোটাংপাসে পর্যটক টানতে হিমাচলের হিল স্টেশন মানালি থেকে শুরু করে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত যাত্রার প্রত্যেকটি জায়গায় ভাড়া পাওয়া যায় স্কি, স্লেজ, স্নো-বাইক। রোটাংয়ে প্রবেশের আগে রাস্তার দুই ধারে জ্যাকেট, গ্লাভস, জুতো ভাড়া দিয়েও কত স্থানীয় পয়সা কামিয়ে নিচ্ছেন। হিমতীর্থ হিমালয়কে পৌরাণিক গাথা, লোকগাথা আর বিচিত্র রূপকথার মোড়কে মুড়ে দুনিয়ার পর্বত আরোহীদের কাছে প্রায় তীর্থভূমিতে পরিণত করেছে নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়। ১৮৯২-এর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কন্যা কুমারিকার তিন নদীর সঙ্গমস্থলের কোনো এক টিলার ওপর স্বামী বিবেকানন্দ বসেছিলেন, তাকে পুঁজি করে কেরালা রাজ্য সরকার কামিয়ে নিচ্ছে দেদার। গোয়া থেকে ৬০ কিলোমিটার পেরিয়ে কারোয়ার সমুদ্রতটে ঝাউগাছের নিচে বসে ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ কবিতাটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। গোয়া সরকার কারোয়ার বিচটির নাম দিয়েছেন টেগোর বিচ। ভাবুন একবার, রবীন্দ্রপ্রেমীরা কি কারোয়ারে গেলে টেগোর বিচ না দেখে ফিরবেন? কেবল পাখি দেখিয়েই দিল্লির সরকার প্যাংগট থেকে আয় করে নিচ্ছে কত হাজার ডলার। অথচ পাখির দেশ বাংলাদেশ পাখি দেখানোর জন্য তেমন কী কী উল্লেখযোগ্য আয়োজন করেছে বলতে পারব না। বিপণন সক্ষমতার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারে চীন। চীনের প্রতিটি রাজ্যে পর্যটক টানার জন্য আছে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা। কুনমিংয়ের হারবাল মেডিসিন প্ল্যান্টগুলোতে বিনামূল্যে পাবেন নানারকম ভেষজ ফুট মাসাজ। মুফতে ফুট মাসাজ নিতে পেরে পর্যটকরা যখন আপ্লুত তখনই তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় ওষুধের গুণাবলী সংবলিত নানান নির্দেশিকা। যার অন্তত একটি কেনা পর্যটকদের জন্য বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের উপকূলের একটি প্রাণবন্ত গ্রাম দেখতেও কিন্তু আগ্রহী পর্যটকরা। দরকার কেবল শুকনো খাবার, স্বাস্থ্যকর পানীয়, গোসলের পোশাক, তোয়ালে আর শতরঞ্জি। সবুজে মাখামাখি, গাছগাছালিতে ঠাসাঠাসি, নিবিড় নির্জন ৬৮ হাজার গ্রামের এই বাংলাদেশ। অথচ একটি গ্রামকেও পর্যটকবান্ধব করে তোলা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশে রয়েছে কত ইতিহাসখ্যাত নগরী। কিন্তু সেসবের ওয়েবসাইট ভার্সন আপডেট করা হয় না। এমন অনেক পেশাদার পর্যটক আছেন, যারা রিসোর্টের চেয়ে সস্তায় রাত কাটানো যায়, এমন যে কোনো একটি ঘরে থাকতে চান। কেননা যত পয়সা বাঁচবে তত বেশি ভ্রমণ স্পট দেখার তাদের সুযোগ হবে। এই শ্রেণির পর্যটক টানতেও সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারিনি আমরা। আমাদের রয়েছে ৩৬ লাখ শিক্ষিত বেকার তরুণ। পর্যটন মন্ত্রণালয় কি এই তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গাইড হিসেবে তাদের কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারে না? ভ্রমণপ্রেমীদের ছুটি চর্চার সেরা সময় চলছে। কিন্তু বাংলাদেশ কি পেশাদার পর্যটকদের সেভাবে টানতে পারছে? পর্যটকদের মনোযোগ কাড়ার মতো অন্তত হাজারটা স্পট এবং অসংখ্য ইতিহাসখ্যাত নগরের উপযুক্ত ব্রোসিয়ার নেই। প্রতি বছর যত লাখ বাংলাদেশি পর্যটক বিদেশ ভ্রমণ করেন ঠিক তত বা তারচেয়ে বেশি পর্যটক কি বাংলাদেশে আসেন? নিশ্চয়ই নয়। পেশাদার পর্যটকদের দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি দরকার। একটি নিরাপত্তা অন্যটি যোগাযোগের ভাষা। এই দুই সূচকেই উন্নত হওয়ার আরো অনেক সুযোগ আছে। এবার শীতেও আমরা ডেঙ্গু আতঙ্কে আছি। কোনো দেশে যাওয়ার আগে গুগল আর্থে সার্চ দিয়ে পর্যটকরা সে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনে নেন। অনেক পর্যটকই অনাগ্রহী হবেন এ জন্য। খেজুরের রস, মসলিন শাড়ি, পাটপণ্য, গরুর গাড়ি, ধান ভানার ঢেঁকি, সরিষা ক্ষেত, বাঁশঝাড়, বাঁশের ঝাড়ে কঞ্চি কাটা, টেঁটা দিয়ে মাছ ধরা, আটা তৈরির যাতা, পাতকুয়া, পুঁথিপাঠের আসরসহ অন্তত কয়েক শ’ বিষয়ের নাম করা যেতে পারে, যা ব্র্যান্ডিং হয়ে পর্যটক টানতে পারত। আমরা পারিনি। কেন পারছি না তা নিয়েও কি কোনো মাথাব্যথা আছে আমাদের?

n লেখক :প্রাবন্ধিক