ত্যাগ ও আদর্শের রাজনীতির আহ্বান নেতাকর্মীদের মধ্যে কি সাড়া জাগাবে?

গত ২০ ও ২১ ডিসেম্বর জাঁকজমকভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একুশতম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। উদ্বোধনী দিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমবেত নেতাকর্মীদের ত্যাগ, উত্সর্গ ও আদর্শের রাজনীতি করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য ও অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে কোড করে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানের পুনরাবৃত্তি করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রায় সব বক্তব্যেই রাজনীতিতে ত্যাগ ও আদর্শের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। রাজনীতিবিদের সব সময় ভাবা উচিত তিনি দেশ ও জনগণকে কী দিতে পেরেছেন; তিনি কী পেলেন, না-পেলেন সে হিসাব তাদের করা উচিত নয়। রাজনীতিবিদরা জনগণের সেবক। সেবার মনোবৃত্তি নিয়েই তাদের কাজ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সৈনিকদের আদর্শ ও ত্যাগের সৈনিক হতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। দেশের ও জনগণের জন্য তার মহান ত্যাগ ও আদর্শের কাহিনি জেনে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে, তাদের সেবা করতে হবে। তবেই আদর্শবান ও ত্যাগী রাজনীতিবিদ হওয়া যাবে। এসব কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময়ই বলে থাকেন।

বঙ্গবন্ধু সারা জীবন ত্যাগ ও আদর্শের রাজনীতি করেছেন। নিপীড়িত বাঙালিদের দুঃখ, দুর্দশা ও দরিদ্রতা তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। তিনি বাঙালিদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আপসহীন সংগ্রাম করেছেন। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির জন্য স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়া আবশ্যক বিধায় তিনি বাংলার স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সাল থেকে ধাপে ধাপে বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচির মাধ্যমে জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণের তার সুপ্ত বাসনা ধীরে ধীরে প্রকাশ পেয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শারীরিক অবয়ব যেমন বড়ো তথা দীর্ঘাকার ছিল, তার মনও তেমনি ছিল বড়ো। তার ব্যক্তিত্ব ছিল আকাশছোঁয়া। কণ্ঠ ছিল বজ্র। হূদয় ছিল উদার। নীতিতে ছিলেন মহান। অন্যায় শোষকদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন লৌহমানব। আবার দরিদ্র ও নির্যাতিতদের জন্য তার মন ছিল অনেক কোমল। বঙ্গবন্ধু চলনে-বসনে ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা; আচরণে ছিল আভিজাত্য কিন্তু সহজ-সরল। তার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাসভবনে রক্ষিত আসবাবপত্র ও অন্যান্য সাজসজ্জা ছিল অত্যন্ত সাধারণ মানের। ছিল না কোনো দামি জিনিসপত্র। ছিল না কোনো মূল্যবান সাজসজ্জা। অথচ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তত্কালীন সামরিক শাসকরা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে অতিরঞ্জিত করে বঙ্গবন্ধুকে হেয় করার হীন অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

মহাকালের মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু ছিলেন পরশপাথর সমতুল্য। তার সংস্পর্শে কেউ এলে বঙ্গবন্ধুর বিশাল হূদয় ও ব্যক্তিত্বের ছোঁয়ায় তার মধ্যে অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তন আসার কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এরকম চিত্রের অনুপস্থিতি দেখেছি। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের জন্য জাতির পিতা যখন অক্লান্ত ও আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনো তার দলের কিছু কিছু নেতাকর্মী দুর্নীতি ও অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহাপুরুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েও তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধের জাগরণ হয়নি। বঙ্গবন্ধু দুস্থ মানুষের জন্য বিদেশি বন্ধুদেশ থেকে খাবার, বস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী আনতেন। আর তার দলের কিছু কিছু নেতাকর্মী সেই রিলিফ নিয়েও দুর্নীতি করেছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধু আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘মানুষ পায় স্বর্ণের খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে আমিও একজন। আমার কম্বলটি কোথায়?’

বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের মুক্তির জন্য বাকশাল গঠন করে দ্বিতীয় বিপ্লব শুরু করেছিলেন। লক্ষ্য ছিল এদেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর। বাকশাল ছিল প্রশাসনিক সংস্কার, ক্ষেত-খামার ও কলকারখানায় উত্পাদন বৃদ্ধি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিপ্লব করা। বাকশালে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে থানা, জেলা ও জাতীয় পরিষদে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থাও ছিল। দারিদ্র্যমুক্ত সুখী ও উন্নত বাংলাদেশ তৈরি করাই ছিল বাকশালের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের দেশি-বিদেশি অশুভ শক্তি বাকশালের অপব্যাখ্যা দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি অশুভ শক্তি এ মহান ব্যক্তি জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে দেশের অগ্রগতিকে শুধু থামিয়েই দেয়নি, বাংলাদেশকে পাকিস্তানি কায়দায় চালানোর চেষ্টা করে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কেন তখন প্রতিবাদ করেনি, রাস্তায় নেমে আসেনি, সে প্রশ্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ অনেকেরই। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার ত্যাগ ও আদর্শের কথা বলেন। বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণের জন্য বঙ্গবন্ধুর সৈনিকদের আহ্বান জানান।

কিন্তু সে আহ্বান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হূদয়ে কতটুকু নাড়া দিতে পারবে—সেটাই প্রশ্ন। বর্তমানে রাজনীতির যে অপসংস্কৃতি ও দৌরাত্ম্য সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে বের হওয়া একটি কঠিন কাজ। শাসক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সাধারণ জনগণের ওপর খবরদারি করার একটা মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এমন অভিযোগও আছে, কোনো কোনো সংসদ সদস্য সব বিষয়ে প্রয়োজনাতিরিক্ত খবরদারি করতে চান। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যানের অধিভুক্ত বিষয়ে তো হস্তক্ষেপ করেনই, অনেক সময় গ্রাম্য সালিশ-বিচারেও মাথা ঘামান। একজন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতার দাপটে তার আশপাশের লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে—এমন অনেক অভিযোগও আছে। কোনো কোনো নেতাকর্মীর এমন আচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে এলাকার অনেকেই অবস্থার পরিবর্তন চান। ত্যাগ ও আদর্শের বাণী নেতাকর্মীদের অনেকের মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসে বলে প্রতীয়মান হয় না। তারা আধিপত্য ও  নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত থাকেন। 

বিরোধী দল বলেন বা অপরাপর রাজনৈতিক সংগঠনের কথাই বলেন, সবার মধ্যে একই প্রবণতা। বিএনপি-জামায়াত ও জাতীয় পার্টিও ক্ষমতায় ছিল। অসাংবিধানিক শক্তিও ক্ষমতায় ছিল। সবার মধ্যেই ত্যাগ, ন্যায়-নীতি ও আদর্শের নমুনা দেখা যায় নাই। তাদের অধিকাংশই ব্যক্তিস্বার্থের ওপরে উঠে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেননি। সামরিক সরকারগুলো তো রাজনীতিবিদদের চরিত্র হরণ করে রাজনীতিকে কলুষিত করেছিল। রাজনীতির অঙ্গনকে সুবিধাবাদী ও  নীতিবর্জিত কিছু ব্যক্তিবর্গের প্ল্যাটফরমে রূপান্তরিত করেছিল। জেনারেল জিয়াউর রহমান দম্ভোক্তি করে বলতেন, ‘আমি রাজনীতিকে কঠিন করে দিয়েছি।’ আসলে তিনি গণতন্ত্রকে হত্যা করে রাজনীতিকে কলুষিত করে দিয়ে গেছেন। সে ধারাবাহিকতা থেকে এখনো বের হওয়া সম্ভব হয়নি।

রাজনীতি করলে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ধনসম্পদে ফুলে-ফেঁপে উঠতে পারবেন, ক্ষমতাবান হতে পারবেন, মানুষকে শাসন করতে পারবেন, পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সালাম ও তোয়াজ পাবেন, তাদের ওপর দিয়ে খবরদারি করতে পারবেন—এ ধরনের মানসিকতা রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজমান থাকলে তারা কখনো জনগণের সেবক হতে পারবেন না। নীতিআদর্শ তাদের কাছে তুচ্ছ মনে হবে। রাজনীতিকে তারা অর্থসম্পদ উপার্জন ও ক্ষমতা লাভের হাতিয়ার হিসেবেই নেবেন। কোনো কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম থাকতে পারে। কিন্তু সংখ্যায় তা নিতান্তই কম। এ রকম রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্যাগ ও আদর্শের উদাত্ত আহ্বান। বঙ্গবন্ধুর রক্ত তার ধমনিতে প্রবাহিত। তিনি বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও আদর্শকে বাল্যকাল থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে তার আদর্শিক ব্যক্তি হিসেবে অনুসরণ করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা বিনির্মাণে তার প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, নেতৃত্ব ও ভিশন নিয়ে দিনরাত অক্লান্ত  পরিশ্রম করছেন। শতভাগ সততা, ন্যায়-নীতি, আদর্শ ও  মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে তিনি কাজ করছেন এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। দেশ দুর্বার গতিতে উন্নয়নের শিখরে উঠছে। এ সময় দেশের নেতাকর্মীরা ও প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি ত্যাগ ও আদর্শ নিয়ে জনগণের সেবক হিসেবে লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে আন্তরিক ও সংকল্প নিয়ে কাজ করে, তবেই দেশের অগ্রযাত্রা কেউ রোধ করতে পারবে না এবং জনগণ উন্নয়নের প্রকৃত সুবিধাভোগী হবে। দেশে আইনের শাসন, সুশাসন ও জনহিতকর সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। জনগণ সত্যিকারভাবে দেশের মালিক হওয়ার স্বাদ পাবে। প্রধানমন্ত্রী তার নেতাকর্মীদের সে মেসেজটাই দিচ্ছেন।

n  লেখক :সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল বাংলাদেশ পুলিশ