লক্কড়ঝক্কড় গণপরিবহন ব্যবস্থা আর কতদিন?

মেঘের মতো কালো ধোঁয়া উড়াইয়া, কান ঝালাপালা করা বিকট শব্দ করিয়া ছুটিয়া চলা মুড়ির টিনমার্কা গণপরিবহনের দেখা মেলে আজও। বহু বত্সর পার হইয়াছে, শত শত গাড়িও যোগ হইয়াছে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে। তবু লক্কড়ঝক্কড় গণপরিবহনের যন্ত্রণা রহিয়াই গিয়াছে। উন্নত সেবাদানের নামে বিভিন্ন সময়ে রাজধানীতে নানা কোম্পানির ব্যানারে যেইসকল গাড়ি নামিয়াছে সেইগুলির অবস্থাও আজ শোচনীয়। পরিতাপের বিষয়, রাজধানীর গণপরিবহনে সামগ্রিকভাবে সেবার মান ক্রমশ নিম্নগামী অথচ ভাড়া উত্তরোত্তর বাড়িতেছে। রাস্তায় বাহির হইলেই চোখে পড়িবে এইসব লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন। কোনোটির রঙ চটা, কোনোটির ছাল ওঠা, কোনোটির গ্লাস ও জানালা ভাঙা, কোনোটির আবার দরজাই নাই। কিছু বাসের বাহিরের রঙ ঠিক থাকিলেও আসনগুলির অবস্থা করুণ, সিট ভাঙা আর ছাদ দিয়া পানি পড়ে। ত্রুটিযুক্ত গণপরিবহনে সয়লাব রাজধানী,যেন জরাজীর্ণতার এক নগরী। বলা বাহুল্য যে, ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলিতে চলাচল যেমন বিপজ্জনক, তেমনি ইহা নগরীর সৌন্দর্যও বিনষ্ট করিতেছে।

বিআরটিএ সূত্রমতে, রাজধানীতে ৩৫৯টি রুটে বাস-মিনি বাস চলে প্রায় সাড়ে সাত হাজার। তন্মধ্যে ফিটনেস সনদ হালনাগাদ আছে সাড়ে চার হাজারের মতো গাড়ির। তথ্যমতে, ফিটনেসবিহীন বাস ও বেপরোয়া গাড়ি চালাইবার কারণেই প্রায় ৮০ ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) এক বত্সর নয় মাসে ঢাকার সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করিয়া বলিতেছে, চলতি বত্সরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ২২৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে, মারা গিয়াছে ২১৫ জন। ২০১৭ সালে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে ২৬৭টি, মারা গিয়াছে ২৮০ জন। এমন অবস্থা দাঁড়াইয়াছে,পুরাতন গাড়ি রঙ করিলেই ঢাকার রাস্তায় হইয়া যায় নূতন। বস্তুত ঢাকার রাস্তায় এখনও চলিতেছে ২০-২৫ বত্সরের পুরাতন বাস। কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিতে কিছুদিন পরপর রং পরিবর্তন করা হয়। আবার কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ফিটনেসবিহীন গাড়িকে দেওয়া হয় রুট পারমিট। এমনকি রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি’র বহু বাসেরও ফিটনেস নাই। দীর্ঘদিনের পুরাতন বিআরটিসি’র দ্বিতল বাসগুলিও লক্কড়ঝক্কড়। গত বত্সর যখন এগুলির বিরুদ্ধে অভিযানের প্রস্তুতি চলিতেছে, দেখা গেল, খোদ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ব্যবহূত অধিকাংশ গাড়ি, ট্রাক ও প্রাইভেট কার ২০ বত্সরের পুরাতন।

ঢাকার গণপরিবহন খাতে ব্যাপক অসঙ্গতি ও অনিয়ম দূর করা এবং লক্কড়ঝক্কড় বাসের চলাচল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হইয়াছে বহুবার। কিন্তু স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলের হস্তক্ষেপে তাহা ভণ্ডুল হইয়াছে। জানা যায়, ‘বিশেষ বকশিশ’ ব্যবস্থায় চালিতেছে এইসকল গাড়ি। বিআরটিএ’র অভিযান জোরদার থাকিলে গাড়িগুলি ঢাকার আশপাশে পাঠানো হয়, অভিযান গতি হারাইলে আবার সেইগুলি রাজধানীতে ফিরিয়া আসে। ব্যবহারের অনুপযোগী যানবাহনের মালিকদের অসত্ রাজনৈতিক যোগাযোগ ও দুর্নীতি এই ক্ষেত্রে একটি সমস্যা। কিন্তু ইহার চাইতেও বড় সমস্যা হইল, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের অভাব বা অনাগ্রহ। আবার জনগণের জীবনমান তথা অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ছাড়া অবস্থার পরিবর্তন সুদূর পরাহতই বলা চলে।  সড়কে নৈরাজ্য ও অরাজকতার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলন নাড়া দিয়াছে পুরা দেশবাসীকে। কিন্তু নড়াচড়া নাই সড়ক ব্যবস্থাপনার। এখনও লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি আগের মতোই দাপাইয়া বেড়াইতেছে, চালকের আসনে বসিতেছেন সহকারী। আমরা এই অবস্থার অবসান চাই। কঠোর শৃঙ্খলাবিধানের পাশাপাশি প্রয়োজন লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলি চিরতরে বিদায় করা। ইহার জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও আগাইয়া আসা উচিত।