ক্রমেই বিপজ্জনক হইয়া উঠা গ্যাসের আগুনে নিহতদের তালিকায় যুক্ত হইল আরও দুইটি নাম— ছায়া রানী (৬০) ও সুমিত্রা (২৭)। সম্পর্কে তাহারা মা ও মেয়ে। বার্ন ইউনিটের চিকিত্সকরা জানাইয়াছেন যে, ছায়া রানীর শরীরের ৯৩ শতাংশ এবং সুমিত্রার ৫৬ শতাংশ দগ্ধ হইয়াছিল। গত বুধবার ভোররাত্রে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার হকবাজার এলাকায় চারতলা ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হইয়াছিলেন ৯ জন। সকলেই একই পরিবারের সদস্য। বাকি ৭ জনের অবস্থাও আশঙ্কামুক্ত নহে। অর্থাত্ সর্বশেষ এই অগ্নিদুর্ঘটনার মধ্য দিয়া বিপন্ন হইতে চলিয়াছে আরও একটি পরিবার। গ্যাসের পাইপ লাইনের ছিদ্র হইতে আগুনের সূত্রপাত বলিয়া ধারণা করা হইতেছে। সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে যে, গ্যাসজনিত দুর্ঘটনার বিষয়টিকে আর কোনোভাবেই হালকা করিয়া দেখিবার অবকাশ নাই। কেবল রাজধানীতেই গত কয়েক সপ্তাহে অনুরূপ বেশকিছু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। আশুলিয়া, সাভার, যাত্রাবাড়ি ও মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত এইসকল দুর্ঘটনার চিত্রও ভিন্ন নহে। প্রতিটি দুর্ঘটনাই একেকটি পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলিতেছে— যেখানে মৃতদের চাইতে জীবিতদের যন্ত্রণাই অধিক। সেই কারণেই এই সকল দুর্ঘটনাকে কেবল মর্মান্তিক বলিলে কমই বলা হয়। অথচ একটু সচেতনতার মাধ্যমেই এই ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটটিকে ইতোমধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম বার্ন ইনস্টিটিউটে পরিণত কারার উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। কিন্তু সেখানেও আগুনে পোড়া রোগীদের স্থান সংকুলান হইতেছে না। অবস্থাদৃষ্টে এই ইনস্টিটিউটের সহিত যাহার নাম অচ্ছেদ্যভাবে জড়াইয়া আছে সেই ডা. সামন্তলাল সেনও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কোনো প্রকার রাখঢাক ছাড়াই তিনি বলিয়াছেন যে, তাহার দীর্ঘ কর্মজীবনে এমন অবস্থা আর দেখেন নাই। তাহার ভাষ্যমতে, প্রায় প্রতিদিনই গ্যাসের আগুনে দগ্ধ রোগী আসিতেছে। এই ধরনের রোগীদের বাঁচানো কঠিন। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর শ্বাসনালি পুড়িয়া যায়। বার্ন ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের মতে, পোড়া রোগীর সংখ্যা ৪০ বছরের রেকর্ড ছাড়াইয়া গিয়াছে। তন্মধ্যে রান্নার গ্যাস হইতে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের সংখ্যা দিনদিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটিতেছে সচেতনতার অভাবে। ত্রুটিপূর্ণ গ্যাসলাইন কিংবা চুল্লি হইতে যেমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিতেছে, তেমনি ব্যবহারকারীদের অসতর্কতার কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনার সংখ্যাও উপেক্ষা করিবার মতো নহে। চুল্লি ঠিকমতো বন্ধ না করিয়া ঘুমাইয়া পড়ার দৃষ্টান্ত যেমন আছে, তেমনি কারণে-অকারণে সর্বক্ষণ চুল্লি জ্বালাইয়া রাখিবার অভিযোগও কম নহে। কেহ কেহ রান্নাঘরে ওড়না ও চাদরসহ নানা ধরনের সহজ দাহ্য পোশাক পরিয়া কাজ করেন। ফলে অসতর্ক মুহূর্তে কাপড়ে আগুন ধরিয়া যায়।
অতএব, সর্বাগ্রে নিজেদের সচেতন হইতে হইবে। গ্যাসের চুলা ও লাইন পরীক্ষা করিতে বা করাইতে হইবে নিয়মিত। সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই—একথা সত্য, তবে সেই সচেতনতা আপনাআপনি আসিবে না। বলা বাহুল্য, এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গ্যাস কর্তৃপক্ষের দায়িত্বই অধিক। সচেতনতামূলক ব্যাপক প্রচার কার্যক্রমের পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ ও অবৈধ গ্যাস লাইনগুলির ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণেও তাহাদের উদ্যোগী হইতে হইবে জরুরিভিত্তিতে।