সংসদ নির্বাচন ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা

বাংলা সাহিত্যে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রবাদ প্রবচন। এসব প্রবাদ প্রবচন প্রায়ই হূদয়কে আন্দোলিত করে ভাবিয়ে  তোলে। কখনো  কখনো কিছু প্রবাদ প্রবচন জীবনের গতি প্রকৃতির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। ইদানীং একটা  প্রবাদ আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলেছে। হয়ত-বা এই প্রবাদটি আমাদের বাস্তব অবস্থাকে নির্দেশ করছে তাই। প্রবাদটি হলো, “পাটা-পোতাইলে ঘষাঘষি, মরিচের ত্রাহি ত্রাহি।” প্রবাদটিতে মূলত দুটি অবস্থার জাঁতাকলে পড়ে তৃতীয়জনের বিড়ম্বনার চিত্র ফুটে উঠেছে। আমাদের দেশেও ঠিক তেমনি। রাজনৈতিক বা অন্য যেকোনো সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হলে বারবার নির্যাতিত হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। অথচ এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তাদের জীবন, সহায়-সম্পত্তি, সম্ভব সব দিয়েছে এদেশের স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সংখ্যালঘু পরিবারগুলো যখন দেশে ফিরে আসে, তখন অনেকের বাড়িঘর সব পুড়ে ছারখার, বসতভিটা জমিজমা অন্যের দখলে। অনেকে তখন এদেশ ত্যাগে বাধ্য হয়।

ভারতে বাবরি মসজিদকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার পরও এদেশে শুরু হয় সংখ্যালঘুদের বসতবাড়ি পোড়ানো ও হত্যা। তখনও কিছু সংখ্যক সংখ্যালঘু দেশত্যাগে বাধ্য হয়। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় যাওয়ার পর এদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর নতুন করে শুরু হয় নির্যাতন, তখনো কিছু সংখ্যক সংখ্যালঘু দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়। অর্থাত্ যতবার এই সংখ্যালঘুরা এদেশ ত্যাগ করেছে, ততবারই বাধ্য হয়ে করেছে। তারপরেও অধিকাংশ সংখ্যালঘু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এদেশের মাটিকে ভালোবেসে পড়ে আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উসকানির ছবি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ঘটনা থেকে দেখা যায়, এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী অনেকেই জড়িত।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এইসব নির্যাতনের কোনো বিচার হয় না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি সংখ্যালঘু নির্যাতনের মাত্রা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। তাই নির্বাচন আসলে সংখ্যালঘুরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়। কারণ এদেশে অতীতের নির্বাচনগুলো সংখ্যালঘুদের জন্য সুখকর ছিল না। নির্বাচনের পূর্বে এবং পরে তাদের বসতবাড়ি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ হয়েছে। এবারের নির্বাচন বিভিন্ন কারণে সংখ্যালঘুদের জন্য আরও বেশি আতঙ্কের। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তাই প্রশাসনকেই এই ভয় দূর করা এবং তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে। সংখ্যালঘুরা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে এবং নির্বাচনের পরে তাদের জানমালের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ  ব্যবস্থা নিতে হবে। ২০০১ সালের  নির্বাচনের পরে সংখ্যালঘুদের ওপর যে নৃশংসতা হয়েছিল আর যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়। 

n লেখক : সংস্কৃতি কর্মী