চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত কনসার্ন সার্ভিস ফর ডিজেবলের(সিএসডি) প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বজিৎ গুপ্ত বিশু। ১৯৮৮ সালে শাটার ট্রেনে পা হারানোর পর থেকে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অর্থ সংগ্রহের জন্য মাঝে মধ্যেই পোহাতে হয় ঝামেলা। কিন্তু তার সেই কষ্টে ভাগ বসাতে স্বেচ্ছায় নাম লেখেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র আজম নাছির।
বিশ্বজিৎ গুপ্ত বিশু বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিমাসে ২০ হাজার করে টাকা দেন তিনি (মেয়র নাছির)। খুব কম মানুষকে দেখেছি এভাবে এগিয়ে আসতে। তার সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে দেখা হয় ২০১৭ সালে। আমার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তিনি জানতে চান। আর তখন থেকেই প্রতি মাসে টাকা প্রদান করে আসছেন তিনি স্বেচ্ছায়।
প্রতিমাসের বেতনের সবটুকুই দান করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আজম নাছির। কিন্তু কাদের সেই অর্থ প্রদান করেন তার খোঁজ করতে গিয়ে জানা যায় বিশ্বজিৎ গুপ্তর মত এমন অনেকের কথা। শুধু তিনি একা নন এমন আরো বেশ কিছু প্রতিবন্ধী ও ছিন্নমূল শিশুদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান কর আসছেন মেয়র নাছির। শুধু তাই নয়, কর্পোরেশনের বোনাসের টাকাও তিনি চট্টগ্রামের অসহায়, দুস্থ-গরিব’দের দান করে দেন।
সিএসডির মতই আরেকটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম অন্ধ বিকলাঙ্গ কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি লি.। এখানে প্রতিবন্ধীদের কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা হয়। তাদেরও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছেন মেয়র নাছির। নাসিরাবাদে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত মো. আলমগীর হোসেন জানান, প্রায় ৪ বছরের বেশি সময় ধরে অর্থ সাহায্য প্রদান করছেন মেয়র নাছির।
চট্টগ্রামের হালি শহর হাউজিংয়ে অবস্থিত প্রেরণা অটিজম স্কুলকেও প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে অর্থ সাহায্য প্রদান করে আসছেন এই মেয়র। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল সেক্রেটারি নাজিম উদ্দিন জানান, ১৫ জন শিক্ষক নিয়ে ২ শিফট চলে আমাদের এই স্কুল। স্কুলের নির্বাহী খরচ মেটাতে দারুণভাবে তাদের সহায়তা করে এই অর্থ। ২০১৮ সালের মার্চ মাস থেকে স্কুলের ঘর ভাড়া ও অন্যান্য নির্বাহী খরচ প্রদান বেশ সহজ হয়ে যায় তার দেয়া অর্থ সহায়তার কল্যাণে।
শুধু প্রতিষ্ঠান নয়। ব্যক্তিগতভাবে কেউ সহায়তার জন্য গেলেও তাকে ফেরান না মেয়র নাছির। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করছিলেন সুমি আক্তার। কিন্তু আর্থাইটিস সমস্যার কারণে ব্যাহত হচ্ছিল তার লেখাপড়া। চিকিৎসা খরচ নিয়ে তিনি ছিলেন বেশ দুশ্চিন্তায়।
সুমি বলেন, আমি তার কাছে বড় কোন আশা নিয়ে যাইনি। বন্ধুদের পরামর্শে প্রেসক্রিপশন নিয়ে তার কাছে যাবার তিনি। আমার কাগজপত্র দেখেন এবং বলেন, ‘তোমার ওষুধের খরচ প্রতিমাসে পেয়ে যাবে।’ আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো এটি। মাস্টার্স শেষ করার পর তিনি আমার জন্য চাকরিরও ব্যবস্থা করে দেন।
আজম নাছিরের কাছ থেকে এককালীন বড় সাহায্য পেয়েছিলেন চট্টগ্রামের রাউজানের বাসিন্দা রুবি খানম। এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার। কিন্তু গার্মেন্টসে স্বামীর মৃত্যুর কারণে পুরো পরিবার আর্থিক সমস্যার মধ্যে পড়ে যায়। এ সময় গার্মেন্টস থেকে সহায়তা দেবার আশ্বাস থাকলেও তা পাননি তিনি। মেয়র নাছির সম্পূর্ণ বিষয়ে অবগত হবার পর এই পরিবারের হাতে তুলে দেন ২ লাখ টাকার চেক। সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে নেয়ার জন্য এই খরচ প্রদান করেন তিনি।
এমন আরো বহু পরিবার ও প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করে আসছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নাছির। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো নিয়ে আমি খুব বেশি কথা বলতে চাইনা। নিজের জন্য কাজগুলো করি আমি। প্রচার বা অন্য কোন কিছুর জন্য নয়। মেয়র হবার আগেও পরিবার নিয়ে চলতাম। তখনও চেষ্টা করেছি সাধ্যমত মানুষের সহায়তা করার। মেয়র হবার পর আমার মাথায় প্রথম যেই ভাবনা আসে সেটি হলো, ‘এই বেতনের টাকা দিয়ে কী করব?’ আসলে এই টাকা ছাড়াও ত আমি বেঁচে ছিলাম। আর সে কারণেই মানুষের ট্যাক্স থেকে আসা এই অর্থ আমার এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে খরচ করার সিদ্ধান্ত নেই।
মেয়র হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে মানুষকে সাধ্যমত সহায়তা করে যেতে চান বলে জানান চসিক মেয়র আজম নাছির।
ইত্তেফাক/আরএ