দেশ এখন নির্বাচনের পথে

ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট গত ১১ নভেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা তফসিল একমাস পেছানোর দাবিও জানিয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ন্যূনতম শর্ত পূরণ করার আহ্বানও করেছেন নেতৃবৃন্দ। ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে অংশগ্রহণকে অভিনন্দন জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতৃবর্গ। যদিও ঐক্যফ্রন্ট নেতারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তকে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের অংশ হিসেবেই চিহ্নিত করছেন। তারা তাদের ৭-দফা দাবি থেকেও সরে যাননি। তাছাড়া ঐক্যফ্রন্ট সরকার ও নির্বাচন কমিশনের আচরণের প্রতি কড়া নজর রাখার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে তাও প্রশংসনীয়।

আসলে দেশ এখন নির্বাচনের পথে হাঁটছে। হাঁটছে না বলে দৌড়াচ্ছে বলা যায়। সেখানে সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চার পরিসর ব্যাপ্ত হয়েছে বলা চলে। কারণ নভেম্বরের ১ থেকে ৭ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যে সংলাপ হয়েছে তার ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিএনপিসহ অনেকগুলো বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কেটেছে বলে মনে করেন তারা। লেখাবাহুল্য, নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী ও ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন বাদ দিয়ে মোট ৩৯টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। এছাড়া, স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে। গত ১০ বছরে শক্তিশালী কোনো বিরোধী দল না থাকায় দেশের সাধারণ মানুষকে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে হয়েছে। এই কারণেই বিএনপি’র ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে অংশগ্রহণকে প্রতিটি মানুষ আনন্দের সঙ্গে অভিনন্দিত করেছে।    

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮। চলতি বছর ৩১ অক্টোবর থেকে নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে। আগামী ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বর্তমান (দশম) সংসদের মেয়াদ রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী ভোট গ্রহণের তারিখ থেকে তিন সপ্তাহ পূর্বে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা চালানো যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ৯ ডিসেম্বরের পূর্বে কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থকরা নির্বাচন প্রচারণা চালাতে পারবেন না। জনগণের চলাচলের বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে, এমন কোনো সড়কে জনসভা এমনকি পথসভাও করা যাবে না। মাইকের ব্যবহারও সীমিত করা হয়েছে। শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে নির্বাচন-বিরোধী যেকোনো ধরনের তত্পরতা।

নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ভিডিপি, আনসার, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্রবাহিনীকেও মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছে সিইসি। ৬ লক্ষাধিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখা হবে। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নির্বাচনে মোট আট দিন সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকবে। নির্বাচনের আগের ৫ দিন, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের পরে আরো দুইদিন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের বাজেট ধরা হয়েছে ৭০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা ব্যয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা, আর আইন-শৃঙ্খলা খাতে ব্যয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এদিকে ইসির সর্বশেষ প্রকাশিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী মোট ভোটার ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ কোটি ২৫ লাখ ৪৭ হাজার ৩২৯ জন ও নারী ৫ কোটি ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ১৫১ জন। ভোটকেন্দ্র ৪১ হাজার ১৯৯টি। ভোটকক্ষ ২ লাখ ৬ হাজার ৫৪০টি। এতে সাত লাখের বেশি ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হচ্ছে। অন্যবারের মতো এবারও নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নিয়োগ করা হয়েছে। আর সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে রয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।

গত এক দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার প্রভাব পড়েছে সর্বত্র। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের তথ্য ও সেবাকেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব তথ্য কেন্দ্র থেকে ২২০টি সেবা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। উপরন্তু মোবাইল ব্যাংকিং, জীবন বীমা, মাটি পরীক্ষা ও সারের সুপারিশ, বিদ্যুত্ বিল পরিশোধ এবং জমির পর্চাসহ অন্যান্য সেবা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রায় ৫ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলোতে মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা টেলিমেডিসিন সিস্টেমসহ চলছে। টেলি-কনফারেন্স এখন সহজ ব্যাপার। এভাবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

আশা করা যাচ্ছে, আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম-আয়ের দেশে পরিণত হবে। কিন্তু ’৭১-এর পরাজিত শক্তিরা বসে নেই; ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। তাই ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সকলকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

n লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়