রাঙ্গামাটিতে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীর নামে স্থাপনা

শামীম হামিদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরে

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের নাম সকল স্থাপনা থেকে ৯০ দিনের মধ্যে মুছে ফেলার উচ্চ আদালতের নির্দেশনা দেড় বছরেও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে। ২০১৭ সালের ২২ মে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এই আদেশ দিয়েছিলেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, দেশের অন্যান্য স্থানে রাজাকারদের ব্যাপারে সরকার যতটা হার্ডলাইনে ছিল, ত্রিদিব রায়সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য রাজাকারদের ব্যাপারে ঠিক ততটা কঠোরতা সরকার দেখায়নি। যে কারণে রাজাকারের নামে স্থাপনা মুছে ফেলার আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে আন্তরিকতা দেখায়নি স্থানীয় প্রশাসন। রাঙামাটি জেলার বনরূপা বাজার ও রাজবাড়ী রোডের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে এখনও ত্রিদিব রায়ের নাম শোভা পাচ্ছে। ত্রিদিব রায়ের নামে করা একটি স্কুলের নাম পরিবর্তিত হলেও স্কুলের বিভিন্ন ডকুমেন্টে আগের নামটি বহাল রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রেও ত্রিদিব রায়ের নাম রয়ে গেছে।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, রাজাকার ত্রিদিব রায়ের নামে এখন আর কোনো স্থাপনা তার জেলায় নেই। কিছু প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে হয়তো নামটি থাকতে পারে। আদালতের রায় পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জেলা প্রশাসন অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ ব্যাপারে রাঙামাটির পৌর মেয়রকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।    

জানা গেছে, ত্রিদিব রায় ছিলেন তত্কালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গামাটি সার্কেলের চাকমা রাজা এবং আত্মস্বীকৃত রাজাকার। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি রাগে, ক্ষোভে ও ভয়ে রাজ্য ও রাজত্ব ছেড়ে পালিয়ে তার প্রিয় পাকিস্তান চলে যান। পাকিস্তানও তার এই ‘প্রকৃত’ বন্ধুকে সম্মানের সঙ্গে ‘উজিরে খামাখা’ (দপ্তরবিহীন মন্ত্রী) এর মর্যাদা দান করে। আমৃত্যু এই পদে থাকার পর ২০১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানেই মারা যান রাজা ত্রিদিব রায়। তার মরদেহ বাংলাদেশে সমাধিস্থ করার জন্য ওই সময় পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে ত্রিদিব রায়ের বিতর্কিত ভূমিকা ইতিপূর্বে তেমন জোরালোভাবে আলোচনায় না এলেও মৃত্যুর পর তিনি বাংলাদেশে আলোচিত হয়ে ওঠেন।

পূর্ব পাকিস্তানের জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বসহ নানা কারণে ত্রিদিব রায় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ত্রিদিব রায় পাকিস্তানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকা অব্যাহত রাখেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে তখনও যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং কিছু পাকিস্তানি সেনা, পূর্ব পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্স এবং রাজাকার বাহিনী পালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল। চাকমা নেতাদের প্রশ্রয়ে সেই সময় ভারতের মিজো বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘাঁটি গেড়েছিল। এহেন পরিস্থিতি মোকাবেলায় ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থানরত বাংলাদেশ বিরোধী সকল উপাদানকে শক্ত হাতে দমন করার জন্যে নির্দেশ দেয়া হয়- যা বাস্তবায়নে বিমান বাহিনী ওই অঞ্চলে বোমা বর্ষণ করেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় ১৯৭২ সালের শেষের দিকে। যদিও ১৯৭২ সালের মার্চে বান্দরবানের রুমা’তে মিজো বিদ্রোহীরা এক পুলিশ স্টেশন আক্রমণ করে ১১ জনকে হত্যা করে এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে যায়।