আয়কর ভীতি দূর করলে বাড়বে নতুন করদাতা

আবদুল মহিত

কিছুদিন আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর চেয়ারম্যান করদাতাদের ব্যাপারে ইতিবাচক কিছু কথাবার্তা বলেছেন। এসব কথা যদি সত্যিকার অর্থে পালিত হয়, তবে দেশে অনেক নতুন করদাতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে পারেন এবং লক্ষ লক্ষ নতুন করদাতা সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই প্রথমবার বর্তমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর চেয়ারম্যানের ইতিবাচক কথাবার্তায় মনে হলো তিনি সত্ আয়করদাতাদের দুর্ভোগ ও টেনশন থেকে মুক্ত করতে চান। এনবিআরের চেয়ারম্যান কিছুদিন আগেই করদাতাদের বিনা কারণে বা সামান্য ভুলের জন্য হয়রানি থেকে মুক্ত করতে একটি কঠিন কথা বলেছেন। ঐ কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমি হয়রানিমুক্তভাবে করদাতাদের কর দেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কিছু প্রস্তাবনা রাখছি।

কিছুদিন আগে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখলাম, চেয়ারম্যান সাহেব বলেছেন, অযথা হয়রানি করলে হয়রানিকারীকে শাস্তি দেওয়া হবে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশের অনেক করদাতা ও ব্যবসায়ী ভালো লেখাপড়া জানেন না, সেক্ষেত্রে রিটার্ন ফরম পূরণে কিছু ভুলভ্রান্তি হয়, কিন্তু এই ভুলের কারণে যদি ট্যাক্স কম-বেশি না হয় এবং ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার কোনো চেষ্টা পরিলক্ষিত না হয়, তাহলে সেই করদাতাকে কোনোরূপ হয়রানি করা যাবে না এবং সঠিকভাবে সংশোধিত রিটার্ন জমা দিতে বলা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ট্যাক্স রিটার্ন ফরমগুলো ভীষণ জটিল হয়। আমি বহু বছুর যাবত্ ট্যাক্স দিয়ে থাকি এবং আমি অশিক্ষিত নই। তারপরও আমি এখনো এই ফরম সঠিকভাবে পূরণ করতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলি। কাজেই সাধারণ করদাতা ও নতুন করদাতাগণ এই ফরম পূরণ করতে গিয়ে তাদের ভুলভ্রান্তি হবেই। এবং এজন্য নানারূপ হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়। অথচ রিটার্ন ফরম যদি মাত্র দুই-তিন পৃষ্ঠায় সহজ করা হয়, অর্থাত্ এক পৃষ্ঠায় আয় এবং অন্য পৃষ্ঠায় ব্যয় এবং তৃতীয় পৃষ্ঠায় সম্পদ বিবরণী এবং সরল ক্যালকুলেশনে ট্যাক্স দেওয়া যায়, তবে ছোটো ছোটো করদাতা ও নতুন করদাতারা উপকৃত হবেন এবং করভীতি থেকে মুক্ত থাকবেন। তবে রিটার্ন ফরমে পাশাপাশি যদি পূর্বের করবর্ষ ও বর্তমান করবর্ষের আয়-ব্যয় ও সম্পদ বিবরণী থাকে, তাহলে এতে ট্যাক্স কর্তৃপক্ষের বুঝতে সুবিধা হবে। 

তৃতীয়ত, কর রিটার্ন ফরমগুলো তিন-চার রকম করা যেতে পারে। যেমন : ক) বেতনভোগীদের জন্য এক রকম; খ) বেতনভোগী + বাড়িভাড়া পায় + কিছু সঞ্চয়পত্র + কিছু কোম্পানির শেয়ার আছে এইরূপ সুনির্দিষ্ট গ্রুপের জন্য আলাদা একটি ফরম; গ) ছোটো ব্যবসায়ীদের জন্য আরেক রকম ফরম (এই ফরমগুলো দুই-তিন পৃষ্ঠার মধ্যে সহজ করতে হবে, কারণ এদের কোনো শিক্ষিত হিসাবরক্ষক রাখার সামর্থ্য থাকে না; ঘ) ছোটো লিমিটেড কোম্পানির জন্য একটি আলাদা ছোটো ফরম; ঙ) বড়ো লিমিটেড কোম্পানি + পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি + করপোরেট কোম্পানিগুলোর আলাদা একটি বড়ো ফরম।

এরূপ হলে অনেক নতুন করদাতা উত্সাহিত হবে। আমি এমন অনেককে চিনি, যিনি কর দিতে আগ্রহী, কিন্তু এই জটিল রিটার্ন ফরম দেখে এবং যারা বর্তমান কর দেন তাদের ৯০ শতাংশের মুখে হয়রানির কথা শুনে কর দিতে বা করদাতা হতে ভয় পান। আমার বর্তমান বয়স ৮৮ বছর। আমি ৬৫ বছরের বেশি সময় ধরে ইনকাম ট্যাক্স দিচ্ছি, কিন্তু আমি এখনো ইনকাম ট্যাক্স-ভীতি থেকে মুক্ত হতে পারিনি।

একজন কর দেওয়ার মতো সংগতিপূর্ণ ব্যক্তি দেশের রাস্তাঘাট ব্যবহার করবে, দেশের পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা তাকে সব রকমের নিরাপত্তা দেবে অথচ সাধ্য থাকলেও কর দেবেন না, এটা গুরুতর অন্যায়। সুতরাং এনবিআর যদি নতুন করদাতা সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে আমার জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বিনীতভাবে একটি কথা বলতে পারি—আপনারা নতুন করদাতাকে আহ্বান করুন এবং বলুন, যারা নতুনভাবে আয়কর প্রদান করতে আসবেন, তারা যদি সঠিকভাবে ট্যাক্স রিটার্ন তৈরি করতে না পারেন, তবে তাদেরকে আপনাদের প্রত্যেক অফিসে একজন সাহায্যকারী অফিসার থাকবেন, যিনি তাদের রিটার্নগুলো তৈরি করে দেবেন এবং কর পরিশোধ করতে সাহায্য করবেন এবং এই করদাতাকে প্রথম তিন-চার বছর কোনোরূপ প্রশ্ন করা হবে না।

বাড়িভাড়া ব্যাংকে জমা দেওয়া প্রসঙ্গে বলতে চাই, ভাড়াটিয়াগণ বেশির ভাগই নগদ ভাড়া দিয়ে থাকেন। যারা ভাড়া কম দেখিয়ে ট্যাক্স ফাঁকি দেন, বর্তমান ব্যবস্থায় তাদের ঠেকানোর কোনো উপায় দেখি না। আমার জানামতে, যারা বাড়িভাড়ার ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, তারা অনেক উপায় জানে। যেমন দুটি আলাদা চুক্তি করে ইত্যাদি ইত্যাদি। গাড়ি রিপেয়ারের ওপর এআইটিএর ক্ষেত্রে বলা যায়, বর্তমানে ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট গাড়ি রিপেয়ার মিস্ত্রিদের মজুরি থেকে এআইটি কেটে রাখতে বলছে। গাড়ির মিস্ত্রিদের কাজের বিনিময়ে আমরা সাধারণত ৫০০ থেকে ২-৩ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দিয়ে থাকি। এই গরিব লোকদের সামান্য পারিশ্রমিক থেকে কীভাবে এআইটি কেটে রাখা সম্ভব, তা আমার বোধগম্য নয়।

আপনারা অবশ্যই অবগত আছেন যে ৯০ শতাংশ ডাক্তার ও অ্যাডভোকেট তাদের ক্লায়েন্টদের থেকে লাখ লাখ টাকা ফি নিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা কখনো রসিদ দেন না এবং হাজার হাজার কোটি টাকা আয়কর ফাঁকি দেন। তাদের ধরার ব্যবস্থা করুন এবং তাদের প্রায় সবার ফ্ল্যাট, বাড়ি ও গাড়ি আছে এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টেও অনেক টাকা নামে-বেনামে আছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ লোকের বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকা বা তার ঊর্ধ্বে। কিন্তু অনেকই করভীতির কারণে করদাতা হতে চান না। সুতরাং করদাতার সংখ্যা প্রকৃত অর্থে বাড়াতে চাইলে করভীতি দূর করার সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

n লেখক :একজন বয়োজ্যেষ্ঠ আয়করদাতা