ঘরে অতিথি আসবে আর তাকে সম্মান জানাবে না- এই রীতি নেই বাংলায়। সামর্থ থাক আর না থাক। আত্বীয়-স্বজন এলে খুশি মনে বরণ করাই বাঙালির চিরাচারিত ঐতিহ্য। কালের বিবর্তনে শহুরেয়ানা ক্রমান্বয়ে তৃনমুলে জায়গা করে নিলেও গ্রামীণ জনপদে ঐতিহ্যের সে ধারাবাহিকতা এখনও বিরাজমান।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক সুফী সাধক সিরাজগঞ্জের হযরত শাহ সুফী খাজা বাবা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রঃ) এর ওরশ শরীফে দেশ-বিদেশের অতিথি এবং ভক্ত জাকের ভাই-বোনদের জন্য আপ্যায়নে সেই ঐতিহ্য লালন করছে এখনও। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সত্য বাণী প্রচারের মানবতাবাদী এ দরবার শরীফে এবার ২০২০ সালের বাৎসরিক ৩ দিনব্যাপী পবিত্র ওরশে ভারতের আসাম এবং সারা দেশ থেকে আসা প্রায় ১০ লক্ষাধিক দাওয়াতী ধর্মপ্রাণ মুসুল্লীদের আপ্যায়নে অতীতের মতোই দরবারের বৃহৎ পাকশালা নিয়োজিত ছিল। সকলের সহযোগিতায় দরবারে স্থাপিত দেশের বৃহৎ পাকশালায় ভাত, মাছ, মাংস, সবজি, ডাল রান্নায় ৩ সহস্রাধিক স্বেচ্ছাসেবী রন্ধন কাজে দায়িত্ব পালন করেন। এর মাধ্যমে হয় এই ব্যতিক্রমী খাবার আয়োজন। যা পরিবেশন হয় কুমারদের তৈরি করা মাটির প্রায় অর্ধলক্ষাধীক থালায় (শানকিতে)। অতীতের মতোই সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিয়ে ১০-১১ লাখ মানুষের খাবারের এ বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ হয়েছে।
জানা যায়, শান্তির বারতায় সবরকম আয়োজন ছাড়িয়ে ছিল এর পরিধি। দীক্ষা একটাই- মহান আল্লাহ ও তার রাসুলের সন্তুষ্টি লাভ। সে ধারণা নিয়ে ভারতের আসাম ও বাংলার সম্মিলিত লাখো ইসলামদরদি মানুষ সমবেত হয়েছিল উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক বিশ্ব শান্তি মঞ্জিল খাজা বাবা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রঃ) পাক দরবার শরীফে।
ভারত-বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ১২শ পীর-আউলিয়ার পথ প্রদর্শক হযরত খাজা বাবা ইউনুছ আলী (রঃ) এর ১০৫ তম ৩দিন ব্যাপী ওরশ শরীফ গত ৩ জানুয়ারি শুক্রবার হতে শুরু হয়ে তা ৫ জানুয়ারি রবিবার আখেরি মোনাজাতে বিশ্ব মানবতার মঙ্গল কামনা করে মুল আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।
অন্য বছরের আয়োজনকে ছাপিয়ে এবারও ছিল এর বর্ণাঢ্য আয়োজন। রোববার আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হলেও আরও দুদিন থাকে কার্যক্রম। ধর্মীয় ভাবগাম্ভির্যপূর্ন এই ওরশ শরীফে অতীতের মতো ভারতের আসাম এবং দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন থেকে ১০ লাখের বেশি ভক্তগণের সমাগম হয়। তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, নামাজ আদায়, কোরআন তেলওয়াত, মোরাকেবা মোশাহেদা, গজল, হামদ্-নাথ ও জিকির-আজগারে মুখোরিত ছিল পুরো মাজার শরীফ তথা আশপাশের এলাকা। এছাড়া আগত ভক্ত নারী-পুরুষদের থাকার জন্য এনায়েতপুর মাজার এলাকা সহ পুরো গ্রাম জুড়ে সুবিশাল প্যান্ডেল স্থাপনের পাশাপাশি আপ্যায়নেও গ্রহন করা হয়েছিল বিশেষ আয়োজন।
দরবারের ৪টি বিশাল ঘরের পাকশালাতে সর্বক্ষণ চলছে মাছ-মাংস, সবজি, ভাত, ডাল রান্নার কাজ। এখানে তরকারি রান্নার জন্য ৭২টি এবং ৭৪টি বড়-বড় চুলায় ভাত রান্নায় স্বেচ্ছাশ্রমে নিয়োজিত ছিল ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, স্কুল ছাত্র, নানা বয়সী শিশু-বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ৩ সহস্রাধিক মানুষ। যাদের অক্লান্তিক পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে সুস্বাদু এসব খাবার।ৎ
অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে আসা জাকেরদের আপ্যায়নে যেন কোনো কিছুর কমতি না থাকে সেজন্য কয়েক মাস আগে থেকেই চাহিদা অনুযায়ী করা হয়েছে এর আয়োজন। ওরশে এবার প্রায় ১০ লক্ষাধিক ভক্তের খাবারের জন্য কয়েকশ টন চাল, ডাল, মাছ, মাংস, সবজি, তেল মসলাদী ব্যবহার করা হয়। রান্নায় জন্য শত-শত হাড়ি-পাতিল আগে থেকেই সংরক্ষণ ছিল। যা পুরোটাই ভক্তগণের স্বেচ্ছা সহযোগিতায় হয়েছে।
এদিকে এতো ভক্তের মাঝে খাবার পরিবেশনে এক একরের সুবিশাল খাবার মাঠটি আগে থেকেই করা হয়েছিল সংস্কার। ওরশ শরীফে টানা ৫দিন ২০ ঘন্টা ছিল এখানে খাবার পরিবেশন। ঐতিহ্য নিয়ে মাটির থালা বা শানকিতে আপ্যায়িত হয়েছে ভক্তরা। যেখানে ছিল আদব আর শৃঙ্খলার মিশেল। কেউ কল্পনাই করতে পারবে না এতো বড়ো খাবার আয়োজন ঝামেলাবিহীন হয়েছে। আসলে যারা এই দরবার শরীফের মুরিদ হন, ধর্মীয় অনুশাসন পালনের পর আদবকেই গুরুত্ব দেন বেশি।
দেশের বৃহৎ এই পাকশালার প্রধান খাদেম হিসেবে প্রায় ৪০ বছর ধরে নিয়োজিত চাঁন মিয়া সরকার, ফটিক সরকার, লুৎফর রহমান, কলি মুদ্দিন, আব্দুল কাদের, জুলফিকার, আবু হানিফ এবং ইসমাইল হোসেনের নেতৃত্বে চলে এই বিশাল কর্মকাণ্ড। তারা বলেন, 'এবার ওরশে দেশ-বিদেশের ভক্তদের আগমন অতীতের তুলনায় বেশি হয়েছে। মুলত তারা, খাজা এনায়েতপুরী (রঃ) মাজার জিয়ারত ও ধর্ম সাধনার জন্যই আসে। খাজা পীর ইউনুছ আলী (রঃ) এর নির্দেশিত পথেই তার পাক আওলাদ দরবারের বর্তমান সাজ্জাদানশীন পীর হযরত খাজা কামাল উদ্দিন (নুহু মিয়া) জাকেরদের যথাযথ সম্মান ও আপ্যায়িত করে আসছেন। আর এই আতিথীয়তার জন্য হাজার-হাজার পশু জবাই, কাটা-বাছা ও রান্নায় পাচক সহ ৩ সহস্রাধিক স্বেচ্ছাসেবক গত ৭দিন ধরে নিয়োজিত ছিল। এখানে অক্লান্ত পরিশ্রম করলেও কর্মীরা অসুস্থ্যতা বোধ করেন না। এ সবি সৃষ্টিকর্তার অশেষ মেহেরবানী।'
খাবার পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত মাটির পাত্র (শানকি)
এ পাকশালায় স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করা সহস্রাধিক মানুষ সবাই নিজ-নিজ কর্মক্ষেত্রে গ্রহনযোগ্য। কেউবা চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, তাঁত শ্রমিক কেউবা স্কুল কলেজের ছাত্র। ওরশ শরীফের সময় এলেই তারা নিজ উদ্যোগেই এখানে কাজে যোগ দেন।
প্রায় ৪৫ বছর ধরে পাকশালায় কাজ করা রুপনাই গ্রামের তাঁত শ্রমিক মোহাম্মদ আলী মুন্সী, ব্যবসায়ী মনির হোসেন, আবুল হোসেন, শাহ আলী এবং এনায়েতপুর গ্রামের ৯ম শ্রেনীর ছাত্র মেহেদী হাসান বলেন, 'ওরশের সময় আসলেই আমরা যার যার মত দরবারের পাকশালায় ছুটে যাই। আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভে ইসলামী এই মহা কর্মকাণ্ডে শরীক থেকে ভক্তদের মুখে আমরা খাবার তুলে দিতে কাজ করতে পেরে আনন্দিত। উৎসব মুখর পরিবেশেই সবাই কাজ করে থাকি।'
এদিকে ওরশ শরীফে প্রতিবার আসা ভক্ত জামালপুরের বিশিষ্ট আইনজীবী মোঃ বাকি বিল্লাহ ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শাহীন রেজা বলেন, 'ঐতিহ্যের এই ওরশ শরীফে খাবার আয়োজন দরবার শরীফের কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বেই হয়ে থাকে। সেখানে পাকশালার খাবারটা আমরা পবিত্র নিয়ামক হিসেবেই গ্রহন করি। খাবার যে সুস্বাদ তা কোথাও মেলা ভার। এক কথায় অমৃত। এখানে সৃষ্টিকর্তার অশেষ মেহেরবানীতে স্বেচ্ছা সেবায় খাবার তৈরি হয়ে থাকে বলেই দেশের বৃহৎ এই পাকশালা সবার কাছে সমাদৃত।'
আরও পড়ুন: মদনে ঘুঘু বিক্রির দায়ে জরিমানা
ওরশ শরীফের এই ঐতিহ্যের বর্ণাঢ্য আয়োজন বিষয়ে এনায়েতপুর মাজার শরীফের সমন্বয়কারী মাস্টার সুলায়মান হোসেন, মুরাদ আহমেদ খান ও লিটন সরকার বলেন, আল্লাহ ও তার রাসুলের নির্দেশিত পথ অবলম্বন করে অতীতের মতই জেলা প্রশাসনসহ দরবারের সকল জাকের-ভাই বোনদের সার্বিক সহযোগীতায় এবারের পবিত্র ওরশ শরীফ সু-সম্পন্ন হওয়ায় মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। বিশেষ করে খাবারের আয়োজনটি নিয়ে আমাদের নজর থাকে সবার। যা অতীতের ধারাবাহিকতায় সুশৃঙ্খলভাবে এবারও সমাপ্ত হয়েছে।'
ইত্তেফাক/নূহু