স্বাদ ও পুষ্টিগুণের বিচারে কুল বাংলাদেশের একটি উত্কৃষ্ট ফল। কুল গাছ ছোট থেকে মাঝারি আকারের বৃক্ষ। উচ্চতা গড়ে ৫ থেকে ১৩ মিটার পর্যন্ত হয়। গাছ চির সবুজ, শাখা-প্রশাখা বিস্তুৃত,দ্বিজীবপত্রী ও গভীর মূলী বৃক্ষ। পাতা ছোট, গোলাকার থেকে ডিম্বাকার হয়। বর্ষার শেষে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে গাছে ফুল আসে ও জাতভেদে জানুয়ারী থেকে মার্চ মাসে ফল পাকে । ফল পাকা ও টাটকা অবস্থায় খাওয়া হয় ও ফল হতে আচার, চাটনি এবং অন্যান্য মুখরোচক খাবার তৈরি করা যায়। আমাদের দেশে কুলের অসংখ্য জাত রয়েছে, এসব জাতের মধ্যে অনেক কুলকেই নির্দিষ্ট নামে সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। স্বাদ ও গুণের উপর ভিত্তি করে আমাদের দেশে উত্পাদিত কুলকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়, যথা- উত্তম, মধ্যম ও নিম্ন জাতের। সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গবেষণার মাধ্যমে কিছু কিছু নতুন জাতের কুল আবিষ্কার করেছেন, যেমন- বাউকুল-১, বাউকুল-২, বাউকুল-৩, আপেকুল, বারিকুল-১, বারিকুল-২, বারিকুল-৩। এছাড়াও উন্নত জাতের মধ্যে কুমিল্লা কুল, সাতক্ষিরা কুল, রাজশাহী কুল, থাইকুল আমাদের দেশে চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশের সব জেলাতে কম-বেশি কুল চাষ হয়। তবে রাজশাহী, কুমিল্লা, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ,গাজীপুর জেলায় উত্কৃষ্ঠ জাতের কুলের আবাদ হয়ে থাকে।
দুই ভাবে কুলের বংশ বিস্তার করা যায়। বীজ থেকে ও কলম চারা তৈরি করে। তবে কলম করে বংশ বিস্তারে বংশগত গুণাগুণ অক্ষুন্ন থাকে। বীজ হতে চারা তৈরি করে তার উপর “বার্ডিং” এর মাধ্যমে কলম চারা তৈরি করা যায়। বলয়, তালি অথবা T-বার্ডিং ও ক্লেফট গ্রাফটিং পদ্ধতিতে কলম চারা তৈরি করা যায়। বার্ডিং করার জন্য বীজ চারার বয়স ৯ মাস থেকে ২ বত্সর বা তার বেশিও হতে পারে। মার্চ মাস থেকে শুরু করে জুলাই-আগষ্ট মাস পর্যন্ত সময়ে বার্ডিং করা যায়, তবে এপ্রিল, মে ও জুন মাস উপযুক্ত সময়। এক্ষেত্রে “সায়ন” সংগ্রহের জন্য নির্বাচিত জাত এবং স্টক উভয়েরই পুরনো শাখা-প্রশাখা মার্চ-এপ্রিল মাসে ছাটাই করে দিতে হবে। অতঃপর নতুন শাখা বার্ডিং এর কাজে ব্যবহূত হবে। কুল গাছ যে কোন ধরনের মাটিতে জন্মে এবং লবণাক্ত ও জলাবদ্ধতা উভয়েই সহ্য করতে পারে। তবে ভারী ও সামান্য ক্ষারযুক্ত বেলে দো-আঁঁশ মাটি উত্তম। বাগান আকারে চাষের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি ভাল। তাছাড়া বসত বাড়ির আশ-পাশে, পতিত জমি, পুকুর পাড় ও অনুর্বর ধরনের মাটিতেও কুল চাষ করা যায়। বর্গাকার রোপন প্রণালীতে ৬ থেকে ৭ মিটার দূরে-দূরে সব দিক ১ মিটার আকার গর্ত খনন করতে হবে। জাত ও স্থানভেদে দূরত্ব কম বেশি হতে পারে। চারা রোপনের কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ দিন পূর্বে গর্ত তৈরি ও গর্তে প্রয়োজনীয় সার মাটির সাথে মিশ্রিত করে গর্ত ভরাট করে রাখতে হবে ও গর্তের ঠিক মাঝখানে চারা রোপণ করতে হবে। প্রতিটি গর্তের মাটির সাথে পঁচা গোবর ২০ থেকে ২৫ কেজি, টিএসপি- ২৫০গ্রাম, এমওপি- ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম, ইউরিয়া- ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম মিশিয়ে দিতে হবে। তবে মাটির উর্বরতায় সারের মাত্রা কম বেশি হতে পারে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস কুল চারা রোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। চারা রোপণের পর সেচের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নিয়মিত আগাছা পরিস্কার করতে হবে। উপরি সার প্রয়োগ করতে হবে। রোগ ও পোকার আক্রমণ দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতি বছর ফল সংগ্রহের পর পুরাতন ও রোগাক্রান্ত শাখা-প্রশাখা ছাটাই করে দিতে হবে। তাছাড়া ফল সংগ্রহের পর শাখা-প্রশাখা ছাটাই করে দিলে নতুন উত্পাদিত শাখা-প্রশাখায় কাংখিত ও মান সম্মত ফলন পাওয়া যাবে। সর্বোপরি চারা রোপণ থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে নিয়ম মাফিক সকল পরিচর্যা গ্রহন করলে কুল চাষে ভাল লাভবান হওয়া যাবে।