মুশতাকের মৃত্যু ছিল রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা: স্মারক গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবে বিশিষ্টজনরা

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ২৩:৫৫

গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দী অবস্থায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে লেখক ও মুক্তমনা অ্যাক্টিভিস্ট মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর ঘটনাটি ছিল মূলত ফ্যাসিবাদের আগ্রাসনে রাষ্ট্রের একটি চরম ব্যর্থতার দলিল। মুশতাক আহমেদের কাছে বৈষয়িক সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল তার আপসহীন ও প্রতিবাদী মন এবং দেশের নোংরা রাজনীতি ও সমাজজীবনের রূঢ় বাস্তবতায় তিনি একজন সাহসী আলোকবর্তিকা হিসেবে আজীবন উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন।

‘মুশতাক আহমেদ (ডিলিটেড বাই দ্য স্টেট)’ শিরোনামের একটি সদ্য প্রকাশিত বিশেষ স্মারক গ্রন্থের আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা উৎসব ও স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা সভায় দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা এসব ক্ষোভ ও আবেগঘন মন্তব্য করেন। শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর মোহাম্মদপুরের স্যার সৈয়দ রোডে অবস্থিত ‘প্রবর্তনা’ ভবনের মিলনায়তনে ব্যতিক্রমী এই প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করে তরুণ ও প্রগতিশীল প্রকাশনা সংস্থা ‘গয়রহ প্রকাশনী’।

অত্যন্ত গুরুত্ববহ এই বইটি সুদীর্ঘ গবেষণার পর পরম যত্নে সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন মনজুর হোসেন। উল্লেখ্য, বিগত ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের কালো আইন হিসেবে পরিচিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে’ অন্যায়ভাবে কারাবন্দী থাকা অবস্থায় কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে রহস্যজনক ও নির্মমভাবে মারা যান এই সাহসী লেখক, যা সে সময় দেশ-বিদেশে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।

স্মরণসভায় অংশ নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সম্মানিত শিক্ষা উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট মানবাধিকার বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. সি আর আবরার গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের সামগ্রিক রাজনীতি ও সমাজজীবনে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুশতাক আহমেদ চিরকাল এক অনন্য নাম হিসেবে উজ্জ্বল থাকবেন। মুশতাকের সেই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাটি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে এবং পুরো সমাজকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। কারাগারে তিনি যেভাবে কাস্টোডিয়াল টর্চার বা হেফাজতে পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেটা সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক এবং এটি স্পষ্টতই রাষ্ট্রের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা।’

প্রকাশনা উৎসবে সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার মানজুর-আল-মতিন দেশের বিচারিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘মুশতাক আহমেদদের মতো সাহসী সন্তানদের মানুষের মন থেকে কখনো কোনো বুলেট বা কারাগার দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। শারীরিক চরম অসুস্থতার অকাট্য প্রমাণ থাকার পরও যে দলকানা ও মেরুদণ্ডহীন আদালত জীবদ্দশায় ছয়-ছয়বার মুশতাক আহমেদের সম্পূর্ণ বৈধ জামিন নামঞ্জ করেছিলেন, সেই আজ্ঞাবহ আদালত ও বিচারিক সংস্কৃতিকে আমাদের রাজপথে লড়াই করে আমূল বদলে দিতে হবে। ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এই লড়াই আমাদের যেকোনো মূল্যে চালিয়ে যেতে হবে।’ বইটির সংকলক ও সম্পাদক মনজুর হোসেন আবেগাপ্লুত হয়ে জানান, বিগত প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি অন্য সব কাজ ফেলে রেখে কেবল মুশতাক আহমেদের এই স্মৃতি ও দলিলগুলোকে বই আকারে রূপ দিতে দিনরাত কাজ করেছেন।

আলোচনা সভায় লেখক মুশতাক আহমেদের ভাই নাফিসুর রহমান তার ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘মুশতাক বরাবরই অত্যন্ত সাহসী ও বৈচিত্র্যময় মানুষ ছিলেন। তিনি যেমন দেশের বিলুপ্তপ্রায় কুমির চাষ ও সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করেছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকটেও ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক প্রতিবাদী মন। আমাদের এই রাষ্ট্র ও সমাজ অনেক সময় মানুষের বিবেকি মনকে জোরপূর্বক মেরে ফেলে বা চুপ করিয়ে দেয়। কিন্তু মানুষের ভেতরের মনুষ্যত্ব ও মন যাতে মরে না যায়, সে জন্য সমাজে সর্বদাই প্রতিবাদের প্রয়োজন আছে। মুশতাক নিজের জীবন দিয়ে তার সেই প্রতিবাদী মনকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।’

মুশতাকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আনিসদৌল্লা বলেন, মুশতাক আহমেদ কেবল একজন লেখকই ছিলেন না, বরং ভ্রমণ ও পেশাদার ফটোগ্রাফিতেও তিনি অসম্ভব পারদর্শী ছিলেন এবং একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। গয়রহ প্রকাশনীর পক্ষ থেকে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ছন্দা মাহবুব বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি রাষ্ট্রীয় ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে নিমজ্জিত ছিলাম, যা আমাদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে চারপাশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা পালন করতে বাধ্য করেছে। এমনকি এখনো অনেকে সেই ভয় কাটিয়ে নীরবতা ভাঙতে ভয় পান।

এই বিশেষ বইটি ফ্যাসিবাদের সেই ভয়ের নীরবতা ভেঙে সত্য বলার অসীম সাহস দেখিয়েছে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইনের নগ্ন অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে এটি ইতিহাসের এক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জীবন্ত দলিল হয়ে থাকবে।’ অত্যন্ত ভাবগম্ভীর এই অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে সঞ্চালনা করেন রুছেলী খান এবং এতে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত হয়ে অশ্রু সজল চোখে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন লেখক মুশতাক আহমেদের বৃদ্ধা মা জেবুন্নেসা রাজ্জাক ও তাঁর সহধর্মিণী মাসিয়া আক্তার।

ইত্তেফাক/এএম