যুদ্ধদিনের স্মৃতি

প্রায় অর্ধ দশক আগে ১৯৭১ সালে যে-যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তা শুরুতে কেউ কল্পনাই করতে পারেনি নয় মাসের মধ্যে পৃথিবীর মানচিত্র পাকিস্তান ভেঙে আর একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র জন্ম নিতে পারে। আর এই নয়মাসে কোলকাতার সাংবাদিকরা সীমান্ত এলাকায় ঘুরে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছেন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ছয় কোটি বাঙালি একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। আর পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ভারতের ৮০ কোটি মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্রই ভারতবর্ষকে জাগিয়ে তুলল। ওপারে তত্কালীন পূর্বপাকিস্তানে ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে খান সেনারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে বাঙালি নিধনযজ্ঞে। যদিও সেসময় পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সংবাদ আদান-প্রদানের কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থাই ছিল না। সব খবরই আসত রয়টার্স, এপিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংবাদ মাধ্যমের হাত ধরে। ২৫ শে মার্চ ৭১ সাল গভীর রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। অর্থাত্ ৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তানের যে অংশ ছিল পূর্বপাকিস্তান তা হলো বাংলাদেশ, বাঙালির দেশ। আর নয় মাসে খান সেনাদের অত্যাচারে পদ্মা, মেঘনার জল লাল  হয়ে গিয়েছিল। এসব খবর যখন আমরা প্রকাশ করতে লাগলাম তখনই ভারতবর্ষের পার্লামেন্টে দাবি উঠল অত্যাচারিত-নিপীড়িত, ধর্ষিত মানুষগুলোকে বাঁচাতে হবে। দলমত নির্বিশেষে জাতপাতের ঊর্ধ্বে ওঠে সেদিনের সংবাদে একটি আওয়াজ উঠল বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এদিকে সংসদে ঐ আওয়াজে হাজার হাজার নিপীড়িত মানুষ বাঁচার তাগিদে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে গিয়েছে।

এমনই একদিন সম্ভবত এপ্রিলের গোড়ায় সঠিক তারিখটা আমার মনে নেই, আমরা দেখলাম রাইটার্স বিল্ডিং-এর সামনে পূ. প. গাড়ির নম্বর লাগানো ১০-১৫টি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তারা বললেন—তারা মুক্তিযোদ্ধা, পুলিশ তাদের আটকাতে পারল না। দোতলায় উঠে মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জীর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিতে লাগল—আপনারা আমাদের খাদ্য দিন, আশ্রয় দিন, অস্ত্র দিন, আমরা দেশ স্বাধীন করবই। তারা শ্লোগান দিচ্ছে—জয় বাংলা, জয় বাংলা, জয় বাংলা, আমরা মুক্তি চাই, পাকিস্তানকে তাড়াতে চাই। এপ্রিলের ২-৩ তারিখে হঠাত্ সকালেই একটি ফোন বেজে উঠল। ওপার থেকে আনন্দবাজারের সাবেক সহযোগী সম্পাদক প্রয়াত সন্তোষ কুমার ঘোষ বললেন—কি করছ, এখনই একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমার বাড়িতে চলে এস। তিনি আমাকে দেখে চিত্কার করে বলতে লাগলেন—তোমরা কোলকাতায় বসে এখনও কি করছ, বিভিন্ন সীমান্তে সব রিপোর্টার চলে যাও। অফিস থেকে টাকা নিয়ে চলে যাও। আমি অফিসকে বলে দিচ্ছি, তার নির্দেশ অনুসারে অফিসে এসে সহকর্মীদের টেলিফোনে ডাকলাম। আমি সেদিন রাতের ট্রেন ধরে চলে গেলাম বালুরঘাটে। আমার পরিচয় পেয়েই মুক্তিযোদ্ধারা বললেন— আপনাকে আমরা বাংলাদেশে নিয়ে যাব। আপনাকে দেখাব খান সেনাদের অত্যাচার। আমার সঙ্গে ছিলেন প্রয়াত ফটোগ্রাফার সত্যেন সেন। সত্যেনদা আমাকে ফিসফিস করে বললেন— যাচ্ছিস তো, বেঁচে ফিরে আসতে পারবি তো, আমি বললাম, চল না দেখাই যাক। মুক্তিযোদ্ধাদের গাড়ীর কনভয়ে আমরা ফাল্গুন মাসের গোড়ার দিকে একটু একটু শীতের সঙ্গে দিনাজপুরে পৌঁছে একটি রেস্তোরাঁয় খেতে গেলাম। রেস্তোরাঁর মালিক বলল— আপনাদের কোনো খাওন দিতে পারুম না। খান সেনারা এদিকে ঢুকে পড়েছে। সে এক অভিজ্ঞতা, চারদিকে আগুন আর আগুন, বাড়ি জ্বলছে। আবার বালুর ঘাটে ফিরে এসে খবর পাঠিয়ে দিলাম কোলকাতায়। পরদিন সকালে বালুর ঘাটের মুক্তিযোদ্ধারা আমার লেখা দেখে বেশকিছু মুক্তিবাহিনী লোক দাবি করলেন— আপনাকে আমাদের সঙ্গে বগুড়ায় যেতে হবে। এবারও সহকর্মী সত্যেনদার আপত্তি। কারণ তারা বলল বগুড়া যেতে ৩-৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। কিন্তু বগুড়ায় পৌঁছতে আমাদের লাগল ৫ ঘণ্টা। তখন অন্ধকার, রাত ১০টা। চারদিকে গুলিগোলার আওয়াজ, তারিমধ্যে হারিকেনের টিমটিমে আলোয় একটি দোকান খোলা পেলাম। দোকানি বললেন—আরিচা ঘাট পার হয়ে খান সেনারা বগুড়ায় ঢুকে পড়েছে। আমরা বাতি নিভিয়ে দিচ্ছি। আপনারা এখনই চলে যান। আর স্বীকার করছি সেদিন কিন্তু সত্যি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বগুড়া থেকে ফেরার পথে মুক্তিযোদ্ধারা রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিল। যে পথে তারা গিয়েছিল সে পথে না  এসে অন্যপথে আসতে গিয়ে দেখা গেল একটা বড় মাপের খাল, জলে ভর্তি। তার ওপর দিয়ে জিপগাড়ি পারাপার করতে পারে না। মুক্তিবাহিনীর গাড়িতে ছিল গাছ কাটার কুড়ুল। তাই দিয়ে তারা খালের ওপর ফেলে আমাকে হাত ধরে পার করল এবং গাছের ওপর দিয়ে জিপ চালিয়ে তারা চলে এল। সেদিন তাদের সাহস দেখে আমরা মনে মনে ভাবছিলাম ইয়াহিয়ার জল্লাদবাহিনী এদের আটকাতে পারবে না, পারেওনি। আজ ৪৮ বছর পরে সেই ডিসেম্বর মাসেই বাংলাদেশে হতে চলেছে নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে লড়াইটা হচ্ছে স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর যোদ্ধাদের উত্তর পুরুষদের সঙ্গে সেদিনের স্বাধীনতাবিরোধী বাহিনীর উত্তরপুরুষদের। সেদিন যারা ছিল রাজাকার, আলবদর, আলসামস প্রভৃতি সন্ত্রাসবাহিনী, আজকের দিনে তাদের অধিকাংশই জামায়াত।

দিন যত গড়াতে লাগল ওপার বাংলা থেকে এক কোটিরও বেশী লোক এসে গেল আশ্রয়ের সন্ধানে। জেলায় জেলায় খোলা হলো একাধিক শরণার্থী শিবির। এই শিবিরগুলো সফর করলেন ইন্দিরা গান্ধী। প্রত্যেকটি শরণার্থী শিবিরে গিয়ে তিনি শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বললেন। ইন্দিরা গান্ধীর উদ্যোগেই জাপানসহ পশ্চিমের যেসব দেশ স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন—সেইসব দেশের পার্লামেন্ট সদস্যরা দলে দলে কোলকাতায় আসতে লাগলেন। জাপান থেকে এসেছিল জাপানের পার্লামেন্টের নীতিনির্ধারণ কমিটির সাত সদস্যের এক প্রতিনিধি দল। এসেছিলেন আমেরিকার ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি। কল্যানিতে একটি শিবিরে ৭ ফুট লম্বা কেনেডি গর্তের মধ্যে পড়ে গেলেন। পুলিশের লোকজন ও আমরা সকলে তাকে গর্ত থেকে টেনে উঠিয়ে আনলাম। সেখানেও  তিনি থেমে যাননি। তার গোটা স্যুট ছিল কাদায় ভরা। সেখান থেকে গাড়ি করে আমরা এলাম সল্টলেকের শিবিরে। যেহেতু তার জামা-কাপড় নোংরা এবং কাদায় ভর্তি ছিল আমরা তার কনভয়তেই নিয়ে গেলাম সেন্ট্রাল এ্যাভিন্যুতে খাদি ভবনে। সন্ধ্যায় একটি হোটেলে এক সাক্ষাত্কারে কেনেডি বলেছিলেন- তিনি যা দেখলেন তা মার্কিন সিনেটে তুলে ধরবেন, তুলে ধরেও ছিলেন।

ওদিকে পশ্চিমে এখন ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তান বাহিনীর জোর লড়াই চলছে। এই কথাটা ইন্দিরা গান্ধীর সেক্রেটারির কাছ থেকে আমি শুনেছি। নিয়াজীর আত্মসমর্পণ ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ওয়ার রুমে খবর এলো ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে ভারতীয় ফৌজ পাকিস্তানের লাহোর দখল করে নেবে। ইতোমধ্যে ওয়ার রুম থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জগজীবন রাম ও অন্যান্য মন্ত্রী, অফিসাররা চলে গিয়েছেন। খবরটা পেয়ে ইন্দিরাগান্ধী উদ্বেগ ও অস্বস্তিতে ছটফট করতে লাগলেন। নিজের ঘরেই পায়চারি করতে  লাগলেন। সদস্যরা পৌঁছতেই ইন্দিরাগান্ধী প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে বলেছিলেন—বাবুজী এখনই শ্যামকে (‘মানেকশ’) খবর দিন ভারতীয় ফৌজ লাহোরের উপকণ্ঠে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকুক, তাঁরা যেন লাহোর দখল না করে। পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশের মধ্যে পাকিস্তানের যুদ্ধে আমার অর্থের ভাণ্ডার কমে এসেছে। তার ওপর লাহোরের এক কোটি লোকের বাস এই কোটি লোকের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ভারতকে করতে হবে। ভোরের আলো ফোটার আগে ভারতীয় সৈন্যরা লাহোর সীমান্তে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই থাকুন। অর্থাত্ তিনি একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন। আমি এই কথাগুলো শুনেছি ইন্দিরা গান্ধীর সেক্রেটারি আর কে ধাওয়ানের কাছ থেকে। এই খবর দেশ-বিদেশে চাউর হবার সঙ্গে সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বকে গোটা পৃথিবী প্রশংসা করে। শুরু হয়েছিল ৭১-এর মার্চে আর যুদ্ধ শেষ হলো ৯ মাসের মাথায় ডিসেম্বরে। ১৬ তারিখে ঢাকায় নিয়াজীর আত্মসমর্পণের পর আমরা কোলকাতায় দেখেছি আকাশ-বাতাস জুড়ে জয়ধ্বনি— বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই ইত্যাদি ইত্যাদি, জয় বাংলা।

এখনত ঢাকা থেকে অনেক সাংবাদিক আমাকে ফোন করে বলে জয়বাংলা। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ যে ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছি তার বিবরণ লিখতে গেলে এক মহাভারতও হয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ সাংবাদিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপকরা, ইতিহাসবিদরা বলতে শুরু করেছেন—৩০শে ডিসেম্বর জয় বাংলার জয় হবেই।

n লেখক:ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক