সমগ্র বিশ্বে মোট মজুত জলের পরিমাণ এক হাজার ট্রিলিয়ন মেট্রিক টন। তন্মধ্যে সমুদ্রে সঞ্চিত লবণাক্ত জলের পরিমাণ ৯৭.২ শতাংশ। যা মোটেই পানযোগ্য নয়। অপরদিকে ২.১৫ শতাংশ জল জমাটবদ্ধ হয়ে আছে বরফাকারে। সেটিও পানযোগ্য নয়। বাকি .৬৫ শতাংশ জল সুপেয় হলেও প্রায় .৩৫ শতাংশ জল রয়েছে ভূ-গর্ভে। যা উত্তোলনের মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিন পানযোগ্য জল চাহিদা পূরণ করতে হয়। এটি আমাদের কাছে বিশুদ্ধ জল হিসেবে পরিচিত। এই জলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে প্রতিটি মানুষের জন্যে দৈনিক গড়ে ৩ লিটার হারে। ভূ-গর্ভস্থ জল ছাড়া নদ-নদী, খাল-বিল কিংবা পুকুর-জলাশয়ের জল সুপেয় হলেও তা বিশুদ্ধ নয়। তবে সেটিও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। বিশেষ করে গোসলাদি, রান্না-বান্না, জামা-কাপড় ধোয়ার কাজে এ জলের ব্যাপক প্রয়োজন পড়ে। তাতে করে একজন মানুষের সব মিলিয়ে গড়ে ৪৫-৫০ লিটার জলের প্রয়োজন হয়।
অবধারিত সত্য কথাটি হচ্ছে বিশ্বের মোট আয়তনের তিনভাগ জলরাশি হলেও বিশুদ্ধ জল সংকটে ভুগছেন ৮০টি দেশের প্রায় ১১০ কোটি মানুষ। এ ছাড়াও প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ১৮ লাখ শিশু প্রাণ হারাচ্ছে শুধুমাত্র দূষিত জল পান করে। প্রতিদিনের জলপানের চাহিদা মেটাতে কিংবা বিশুদ্ধ জলপান থেকে বঞ্চিত হওয়ার নানাবিধ কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, খরা, ভূ-গর্ভস্থ জলস্তর নেমে যাওয়া কিংবা আর্সেনিকের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াই প্রধান সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে। জানা যায়, বৈশ্বিক উষ্ণতা আর মাত্র এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলেই বিশ্বের মোট ১৪৫ কোটি মানুষ সুপেয় জল সংকটের মুখোমুখি হবেন। তন্মধ্যে এশিয়া মহাদেশে ১২০ কোটি এবং আফ্রিকা মহাদেশে ২৫ কোটি মানুষ এর আওতায় পড়বেন। এর থেকে বাদ যাবে না বাংলাদেশের মানুষও। বরং তুলনামূলক হিসাবে বাংলাদেশের হার বেশিই পড়বে।
তাই সরকারকে এক্ষুণি আঁটঘাট বেেঁধ নামতে হবে নদী খননের কাজে। নদী-নালা-খাল খননের মাধ্যমে হারানো নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতেও সচেষ্ট হতে হবে। তাতে করে আমাদের সুপেয় জল চাহিদার ঘাটতি অনেকখানি কমে যাবে এবং তা সংরক্ষণও হবে। কারণ বাংলাদেশের ভূ-গর্ভস্থ জলস্তর অনেকখানি নিচে নেমে গেছে বেশি বেশি উত্তোলনের ফলে। যা বিশ্বের আর কোনো দেশে এমন নজির নেই। কাজেই আমাদেরকে সাবধান হতে হবে এক্ষুণিই। না হলে মেসোপটেমিয়া, ইথিওপিয়ার প্রাচীন সভ্যতার মতো জল সংকটের কারণে বিশ্বের বুক থেকে হারিয়ে যেতে পারে প্রিয় বাংলাদেশও। কাজেই আমরা সাবধান হবো এক্ষুণি। এমনিতেও বাংলাদেশ রয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ঝুঁকিতে। ফলে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ভাবতে হবে আমাদেরকে।
বিশুদ্ধ জলের বিজ্ঞাপন দিয়ে কিছু কিছু ব্যবসায়ী রীতিমত ট্যাপের জল বোতলে ঢুকিয়ে তা বাজারজাত করে চড়া দামে বিক্রি করছেন। ক্ষেত্রবিশেষ দেখা যায়, দুধ এবং জল সমমূল্যে বিক্রি হতে। তার পরও সেই জল নিরাপদ নয়। নিরাপদ জল ভেবে ক্রেতারা তা পান করার ফলে জলবাহিত রোগে ভুগছেন দেদারছে। এই ধরনের খবর আমরা প্রায়ই সংবাদপত্রের পাতা উল্টালেই দেখতে পাই। এ হীনকর্মের জন্য ধিক্কার জানানোর পাশাপাশি আইনের আওতায় এনে এদের দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি কামনা করছি আমরা। তাহলে জল জালিয়াতির ঘটনা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবেন জাতি। মুক্তি পাবেন জলবাহিত রোগ থেকেও।
n লেখক :কথাসাহিত্যিক ও বন্যপ্রাণী বিশারদ
alamshine@gmail.com