উপজেলা প্রশাসনের কড়া নজরদাড়ি সত্ত্বেও কোনোক্রমেই কমানো যাচ্ছে না বাল্যবিয়ে। ফুলবাড়ী উপজেলায় বাল্যবিয়ের প্রবণতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধরলা বেষ্টিত এ উপজেলার চরাঞ্চলগুলোতে দারিদ্র্যতা ও শিক্ষার অভাব প্রকট। যার প্রধান কারণ হলো মরণব্যাধি বাল্যবিবাহ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসন ও দেশের নামকরা এনজিও আরডিআরএস বাংলাদেশ, ‘বিল্ডিং বেটার ফর গালর্স প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ব্যাপক ভূমিকা নিলেও থামছে না তার রাহুগ্রাস। বিভিন্ন সময় বিছিন্নভাবে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দু-চারটি বাল্যবিয়ে ভেঙে গেলেও পরবর্তীতে অভিভাবকরাই আবার গোপনে সেই বিয়ে সম্পন্ন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত ছয় মাসে শুধুমাত্র বালারহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও দাসিয়ারছড়া বালিকা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৩৩ শিশু শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হয়েছে।
উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কৃষ্ণানন্দবকসী গ্রামের জাবেদ আলী জানান, আমার মেয়ে জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ছেলে ভালো হওয়ায় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। তবে কাজী তার মূল ভলিউম বইয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি করেননি। তবে কিভাবে হলো বিয়ে, এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে জানান, ছেলে কিংবা মেয়েদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হলেও কম্পিউটারের মাধ্যমে কৌশলে নিবন্ধনের বয়স বৃদ্ধি করে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এ সুযোগে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ইউনিয়নের কিছু অসাধু কাজীরা ভুয়া নিকাহ নামায় বিয়ে রেজিস্ট্রি করছেন।
চলতি জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় মুছুল্লীপাড়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসা, মধ্যকাশিপুর দাখিল মাদ্রাসা, ফুলবাড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বালারহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং দাসিয়ারছড়া বালিকা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৪ জন পরীক্ষা দেয়নি। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে সরেজমিনে জানা গেছে, উপরোক্তসহ ফুলবাড়ী উপজেলার ৪টি পরীক্ষা কেন্দ্রে এ ধরনের ৯০ পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এরা বাল্যবিয়ের শিকার।
মুছুল্লীপাড়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসার সুপার নুরুজ্জামান মিঞা ও মধ্যকাশিপুর দাখিল মাদ্রাসার সুপার আবেদ আলী সন্দেহ প্রকাশ করে জানান, অভিভাবকদের বেশি চাপ কিংবা বাল্যবিয়ে সম্পর্কে প্রশাসনকে অবগত করা হলে স্কুলে ভর্তির সময় এর খারাপ প্রভাব পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
ফুলবাড়ী জছিমিঞা সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবেদ আলী খন্দকার জানান, তার কেন্দ্রেই ৪৬ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি।
শিমুলবাড়ী মিয়াপাড়া নাজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন জানান, এবারের জেএসসি পরীক্ষায় ২১ জন মেয়ে পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত রয়েছে। শুনেছি এদের সবার বিয়ে হয়েছে। আরডিআরএস বাংলাদেশ বিল্ডিং বেটার ফর গালর্স প্রজেক্ট-এর উপজেলা ম্যানেজার ঝরনা বেগম জানান, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আমরা উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে সভা-সেমিনার করে যাচ্ছি। অগ্রগতি হচ্ছে। সবার সহযোগিতায় এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাছুমা আরেফিন জানান, অভিভাবকরা সচেতন না থাকায় বাল্যবিয়ে পুরোপুরি রোধ করা যাচ্ছে না। তাই বেশি বেশি করে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে জনসচেতনতার উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। তা হলেই বাল্যবিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হবে।