২০১৩ সালের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কোনো না কোনো শ্রমে নিয়োজিত। এর মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে যুক্ত। এই বিশালসংখ্যক শিশুশ্রমে নিয়োজিত থাকা এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা আট দশমিক সাত অর্থাত্ সকল প্রকার শিশুশ্রম মুক্ত করা অনেক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজন। সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম ও ২০২৫ সালের মধ্যে সব রকমের শিশুশ্রম মুক্ত করার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে হলে সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে একযোগে কাজ করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক।
গতকাল সোমবার সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম দূরীকরণ: এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা আট দশমিক সাত অর্জনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জসমূহ এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) দাতাসংস্থা টেরে ডেস হোমস নেদারল্যান্ড এবং গোলাবাল মার্চ এগেইনস্ট চাইল্ড রাইটস এর আয়োজন করে।
কাজী রিয়াজুল হক বলেন, সরকার এবং শ্রম মন্ত্রণালয় শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা এখনো পিছিয়ে, যা অর্জন করা সম্ভব সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করার মাধ্যমে। এসডিজির এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সাথে দেশের ভাবমূর্তি জড়িয়ে আছে। তাই শিশুশ্রম নির্মূল করার প্রচেষ্টাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এর জন্য সকলকেই প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। একটি আলাদা শিশু অধিদপ্তর বা শিশু কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া এখন চলমান আছে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কলকারখানা মহাপরিদর্শক শামসুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, আমরা যতই শিশুশ্রম নির্মূলে কাজ করি না কেন যদি সকলে সচেতন না হয় তাহলে শিশুশ্রম পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব নয়। পিতামাতাদেরকে সচেতন করা জরুরি যেন তারা তাদের শিশুদের কাজে পাঠানোর ক্ষেত্রে নিরুত্সাহিত হয়।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাকিউন নাহার বেগম বলেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় যাতে ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে সে লক্ষ্যে সাম্প্রতিক শ্রম আইনের খসড়ায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিশুশ্রম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে গৃহকর্মে শিশুশ্রমটাকেও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারটা বিবেচনাধীন। অপ্রাতিষ্ঠানিক কলকারখানাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে এর ফলে শিশু শ্রমিক নিয়োগ করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ সহজতর হবে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান ডঃ খাজা সামসুল হুদা বলেন, দরিদ্র এবং ছিন্নমূল শিশুরা যেন শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়তে না পারে সেই জন্য তাদেরকে কর্মমুখী শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার উপর জোর দিতে হবে। বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকার যেন ভবিষ্যতে আর না বাড়ে সেই জন্য এখনই কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপ্তি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন যাতে আজকের শিশুরা ২০৩০-২০৪০ সালের মধ্যে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে দেশকে সেবা দিতে পারে।
সংস্থাটির পরিচালক আবদুস সহিদ মাহমুদ বলেন, তত্ত্বাবধানের দিক দিয়ে আমাদের এখনো অনেক কাজ করতে হবে। রাজধানীর হিউম্যান হলারের শতকরা ৯০ ভাগ হেলপারই শিশু এবং বেশিরভাগেরই বয়স ১২ বছরের নিচে। এই কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এই কাজে শিশুদের নিয়োগ বন্ধ করা খুবই জরুরি।
টেরে ডেস হোমস নেদারল্যান্ডস এর কান্ট্রি ডিরেক্টর মাহমুদুল কবির বলেন, আমাদের সকলেরই শিশুশ্রমের ব্যাপারে চিন্তাধারা পাল্টাতে হবে। গৃহকর্মে শিশুদের ব্যবহার করাটা যে ঝুঁকিপূর্ণ তা বুঝতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে উন্নতি হলেই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম না কমলে আমরা শিশুশ্রম নির্মূলে আমাদের প্রত্যাশিত সফলতা পাবো না। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, শিশুশ্রম নিরসন বিষয় বিশেষজ্ঞ টিআইএম নূর-উননবী খান।