২০১৯-২০ সালে শেয়ারবাজারে যা ঘটছে, তাকে কোনোমতেই ‘ক্রাশ’ বলা যায় না। এটি স্রেফ ধস। শেয়ারের মূল্যপতন শুরু হয়, স্বাভাবিক থাকা অবস্থা থেকেই। এই ধসের কারণে শেয়ারমূল্য পড়তে পড়তে এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। লিখেছেন— আলি জামান
এবারের এই ধস কেন?
১) বিএসইসি আর কিছু মার্চেন্ট ব্যাংক যোগসাজশ করে এমন অনেক কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে লিস্টিং করে, যাদের তেমন মৌল ভিত্তি ছিল না। অনেক কোম্পানিকে প্রিমিয়াম নিয়ে শেয়ারবাজারে শেয়ার ছাড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ২০১০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত যেসব শেয়ারবাজারে এসেছে, তার মধ্যে ৮০ শতাংশের মূল্যপতন ঘটেছে। এর মধ্যে অনেক কোম্পানির শেয়ার ‘ফেস ভ্যালু’র অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে।
২) এবারের এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে—২০১৯ সালের প্রায় শুরু থেকে। বিএসইসি অনেক আগেই একটি বিধান করেছিল। ঐ বিধানে বলা হয়েছিল যে, শেয়ারবাজারে লিস্টেড প্রতিটি কোম্পানির পরিচালকদেরকে এককভাবে ২ শতাংশ এবং সম্মিলিতভাবে পরিচালকমণ্ডলীকে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। বিধানটি ছিল খুবই যুক্তিযুক্ত। কারণ, কোম্পানির মালিকানায় সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার না থাকলে ঐ কোম্পানি নিজের কাছে তো নয়ই, শেয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে কোনোরূপ দায়বদ্ধ থাকে না। এর ফলে বছর শেষে বিনিয়োগকারীরা ন্যায্য ডিভিডেন্ড থেকে বঞ্চিত হয়। আর বাজারে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। কিন্তু এতকাল আইনটি বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়নি। হঠাত্ করে বিএসইসি বলল, অবিলম্ব্বে এটা কার্যকর হবে। অনেক কোম্পানি, যারা এর আওতায় পড়ে যায়, তার মধ্যে ‘বেক্সিমকো’ অন্যতম। এই সময় বেক্সিমকোর শেয়ার মূল্য ছিল ৩২-৩৩ টাকা। কোম্পানীটির নেট অ্যাসেট ভ্যালু ৭৪ টাকা। এটি অনেক আগের হিসাব। এখন এটি রিভ্যালুয়েশন করলে, তা শত টাকা ছাড়িয়ে যাবে। বিএসইসি এমনভাবে হাঁকডাক করে এই ঘোষণা দিল যে, তারা এর বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। কোম্পানির মালিকরা প্রমাদ গুনলেন। কিন্তু তারা তো অক্ষম নন, বরং বিএসইসির চেয়ে দৃশ্যমানভাবে অনেক শক্তিশালী। তারা ঐক্যবদ্ধ হলো। উদ্দেশ্য, শেয়ারের মূল্য পতন ঘটিয়ে পরে কিনে নির্ধারিত ৩০ শতাংশ কোটা পূরণ করবে। অনেক কথিত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী তাদের সহযোগীর ভূমিকা নিল। শুরু হলো—পরিকল্পিত মূল্য পতন। পুরো শেয়ারবাজারে এর প্রভাব পড়ল।
৩) সবাই বলে, আমাদের শেয়ারবাজারে একদিকে যেমন রয়েছে তারল্য সংকট, তেমনি রয়েছে আস্থার সংকট। কথাটি সত্য। কিন্তু এবারে সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে যা, তা হলো ব্যবস্থাপনার সংকট।
৪) এবারের ধসে সবচেয়ে বেশি মূল্য পতন হয়েছে কিন্তু ভালো মৌল ভিত্তির শেয়ারগুলোতে। এইসব শেয়ারে যারা বিনিয়োগ করেছিল, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এগুলোর অস্বাভাবিক মূল্য পতন ঘটেছে।
৫) একটা ভালো শেয়ারবাজারে অর্থ জোগান দেয় মূলত প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী নয়। অন্য দেশের মতো,আমাদের দেশেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী মূলত ক্লোজএন্ড মিউচুয়াল ফান্ড। আইসিবি এর উদ্যোক্তা। যে দেশের শেয়ারবাজারে মিউচুয়াল ফান্ডের কনট্রিবিউশন বেশি, সেই শেয়ারবাজার তত উন্নত। ভারতে এর পরিমাণ ৪০ শতাংশের বেশি হলেও আমাদের দেশে তা ১ শতাংশের নিচে। শেয়ারবাজার বোঝে না, অথচ বিনিয়োগে আগ্রহী লোকেরা এইখানেই নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করে।
৬) শেয়ারবাজারে ভালো মৌল ভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারে বিনিয়োগ করার জন্য ঋণ নেওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। বিএসইসির দেওয়া ভালো মৌল ভিত্তির তালিকার বাইরের কোনো শেয়ারে মার্চেন্ট ব্যাংক ঋণ প্রদান করে না। অথচ এখন ঐসব ঋণগ্রহীতা বিনিয়োগকারীরাই মূল্য পতনের পর মার্জিন দিতে না পারায়, তাদের শেয়ারগুলি ফোর্সড সেল করে সর্বস্বান্ত করে দেওয়া হচ্ছে। এই সময়ে যে ব্যাপকভাবে মূল্য পতন ঘটছে, তার উল্লেখযোগ্য প্রধান কারণ- এই বেপরোয়া ফোর্সড সেল।
এই অবস্থার উত্তরণ কীভাবে সম্ভব হবে?
১) বিএসইসিতে একটা পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমানে যারা এখানে অধিষ্ঠিত,আইন অনুযায়ী তাদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।
২) অচল মিউচুয়াল ফান্ড সেক্টরটিকে সচল করতে হবে। গ্রামীণ-১, এইমস-১ ফান্ড দুটো একেবারে বন্ধ হলেও আইসিবির ১-৮ ফান্ডগুলো ওপেন অ্যান্ড ইউনিট ফান্ড করা হয়েছে। অবিলম্বে এগুলো রেগুলার শেয়ারবাজারে ফেরত আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি সম্ভব। এর ফলে আস্থা ফিরে এলে, আরো মিউচুয়াল ফান্ড বাজারে এসে তারল্য সংকট দূর করবে।
৩) দুর্বল কোম্পানি যাতে প্রিমিয়াম নিয়ে শেয়ারবাজারে লিস্টেড না হতে পারে, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। বাজারে লিস্টেড হওয়ার পর ঐ শেয়ারের ব্যাপক মূল্যপতন ঘটলে, সেই কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বাইব্যাক আইন এবং শেয়ার লিস্টিংয়ের সঙ্গে জড়িত ইস্যু ম্যানেজারদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট অনেকাংশে দূর হবে।
৪) ডে-নেটিং স্রেফ জুয়া খেলা। ২০১০ সালে ধসের পর এটি বন্ধ করা হলেও ব্রোকার হাউজগুলোর চাপে আবার তা চালু করা হয়। শেয়ার বাজারের বর্তমান অবস্থার জন্য ডে-নেটিং অনেকাংশে দায়ী। তাই, কমপক্ষে ছয় মাসের জন্য তা বন্ধ করতে হবে। ব্রোকার হাউজ আর মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে যত বিরোধিতাই আসুক না কেন। উল্লেখ্য, ২০১০ সালে মার্কেট ক্রাশের পর এটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
৫) শেয়ারবাজারের বিদ্যমান অবস্থা উত্তরণে যদি সরকারের অর্থ সংস্থানের সামর্থ্য থাকে, তবে সেই অর্থ, মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজকে না দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যেসব কোম্পানিকে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের কোটা পূরণ করতে হবে।
৬) এই মুহূর্তেই কমপক্ষে তিন মাসের জন্য ‘ফোর্সড সেল’ বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি করতে হবে। এটা করলে, বাজারে সেল প্রেসার কমে আসবে, নতুন করে মূল্যপতন হবে না। শেয়ারের দাম মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে গেলে মার্জিন কভার হয়ে যাবে, বিনিয়োগকারীদের পুঁজির অনেকাংশ বেঁচে যাবে। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোরও কোনো ক্ষতি হবে না। তারা প্রদত্ত ঋণের টাকা সুদসহ ফেরত পাবে। উল্লেখ্য, এর আগেও শেয়ারবাজারের স্বার্থে, বিএসইসি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।