মনীষী

‘বিস্ফোরণোন্মুখ ক্রুদ্ধ নাগরিক’

 

ওয়াহিদুল হকের জন্ম হয়েছিল ১৯৩৩ সালের ১৬ মার্চ। কেরানীগঞ্জের ভাওয়াল মনোহরিয়া গ্রামের বাড়িতে মা মেওয়া বেগম আর পিতা এ টি মাজহারুল হকের ঘরে জন্মেছিলেন তিনি। গ্রামের বাড়ির চতুর্দিকের প্রকৃতি-পরিবেশ তাঁকে মোহিনী মায়ায় মুগ্ধ করে রাখত। পল্লিবালাদের লীলাময় স্নেহাদরে গাছের পাতার কম্পন আর পাখির ডাকে স্বপ্নময় ছিল তাঁর শৈশব-কৈশোর।

পিতার ওকালতি কর্মসূত্রে শহরজীবনে প্রবেশ ঘটল ক্রমে। গ্রামীণ সারল্যমাখা সুগভীর কৌতূহলে দিনে দিনে শহরে প্রচলিত প্রমিত ভাষা আর আচার-আচারণে অধিকার জন্মাল ওয়াহিদুল হকের। ২৩ নম্বর উর্দুরোডের বাড়িতে দু ভাই আর দু বোনের সমবায়ে তাঁদের পারিবারিক জীবন কেটেছে স্বচ্ছন্দ গতিতে। প্রতিবেশী গৃহের সংস্কৃতিচর্চা তাঁর কল্পনাপ্রবণ গ্রহিষ্ণু মনকে অজানিতে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল।

আরমানিটোলা সরকারি বিদ্যালয়ের সুশিক্ষকদের গুণে এবং বিবিধ সাংস্কৃতিক আয়োজন আর মহড়াতে তাঁর চিত্ত হয়ে ওঠে সুসংস্কৃত। তাঁর লেখা থেকে জানা যায় মহড়া কক্ষে গুণিজনদের প্রতিকৃতি তাঁকে বিপুলভাবে আকর্ষণ করেছে, শ্রদ্ধান্বিত করেছে তাঁদের প্রতি। পরিপার্শ্ব থেকে সংগীত, আবৃত্তি, নাটকের রস টেনে নিয়ে তিনি মনেপ্রাণে ঋদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। ওয়াহিদুল হকের রচনার মর্মে প্রবেশ করবার জন্য তাঁর ক্রমিক বেড়ে-ওঠার এই পটভূমি জেনে-রাখা সহায়ক হবে বলে মনে হয়। আরো জেনে নেওয়া ভালো, ম্যাট্রিক পরীক্ষার একমাস আগে তাঁর পিতৃ-বিয়োগ হয়। একান্ত ঘরনী মায়ের পাশে দাঁড়াতে হয়েছিল পরীক্ষার্থী কিশোরকে। স্বামীর মৃত্যুতে প্রবলভাবে বিচলিত মাতার মনে প্রত্যয় জাগিয়ে তুলতে, শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরবার সহায়তা করতে জ্যেষ্ঠপুত্রটি ছাড়া আর কে-ই বা ছিল! খেলার নেশা, সংগীত-নাটক-আবৃত্তির নেশা, রাজনীতির পাঠগ্রহণ, জীবনকে গভীরভাবে জানবার নেশার সঙ্গে এসে মিলল জীবনের স্বতঃউন্মোচিত কঠিন বাস্তবতা। জীবনকে জানা কাকে বলে! এ তো স্বপ্ন নয়!!

সংসারের চক্রটি সচল রাখবার জন্য মায়ের নিত্য উদ্ভাবনায় কতদূর এবং কতদিন আর তৈল সিঞ্চন করা সম্ভব। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে অচিরে তখনকার ইংরেজি পত্রিকা মর্নিং নিউজে স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে চাকরি নিতে হয় ওয়াহিদুল হককে। তারি ফাঁকে ফাঁকে পড়াশুনা চালিয়ে ক্রমে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে নেন। বিএ পরীক্ষার প্রাক্কালে বিয়ে হবার ফলে সে-বছর পরীক্ষা বানচাল হলো। পরের বছর বিএ পাশ করলেন ওয়াহিদুল হক।

এই গেল তাঁর সংসার আর প্রথাগত শিক্ষা গ্রহণের পটভূমির কথা। আর বিদ্যা? হেন বিষয় নেই যা তাঁর আয়ত্তাতীত থাকতে দেখা গেছে। যে কোনো প্রসঙ্গ চলুক, স্মিত হাসির সঙ্গে সবার চেয়ে ভিন্ন এবং সারগর্ভ কথা তাঁর কাছেই শোনা যেত। তাঁর প্রবন্ধাবলিতে তার বিশেষ পরিচয় লক্ষ করা যাবে।

ওয়াহিদুল হকের লেখাতে প্রায়শ একজন বিস্ফোরণোন্মুখ ক্রুদ্ধ নাগরিককে দেখতে পাওয়া যায়। সংবেদনশীল মন চারপাশ থেকে ক্রমাগত আঘাত পেতে পেতে এমন রাগী চরিত্রের পরিচয় দিতেই পারেন। বাঙালি চিত্তের অসাড়তা, আপন জাতিসত্তার বিস্মরণ, নীতিবিবর্জিত সুবিধাবাদ, অকাতরে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিসর্জন দেবার প্রবণতা, ইতিহাসবিমুখতা ইত্যাকার অসংখ্য ক্ষোভে জর্জরিত হয়ে অনেক সময়ে ধৈর্যহারা হয়ে কটুকাটব্য করেছেন তিনি। নিহিত বেদনাটি ধরতে পারলে এই বিষয়টিকে সহানুভূতিপূর্ণ বিবেচনায় নেওয়া যায়, হয়তো।

একইসঙ্গে বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, সংস্কৃতি, আদি যাবতীয় প্রসঙ্গে বিচরণ করে সুপ্রসর এবং সুগভীর চিন্তারাজি সংক্ষেপে উপস্থাপন করবার ফলে ভাষা কখনো কখনো জটিল এবং দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছে। পাঠকের জ্ঞানের পরিধির ভিতরে সে-সকল বিদ্যার কিঞ্চিত্ সন্নিবেশ না থাকলে, ওয়াহিদুল হকের রচনা দুর্বোধ্য মনে হওয়া স্বাভাবিক।      (অংশবিশেষ) 

সূত্র : ওয়াহিদুল হকের প্রবন্ধ-সংগ্রহ (নবযুগ প্রকাশনী)/সংকলন-সম্পাদনা: সন্জীদা খাতুন