দেশের জ্বালানি সংকটের কারণে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়া তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি আমদানি করিতেছে। আমদানির পরে গ্যাসে রূপান্তরিত করিয়া পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকের নিকট পৌঁছাইতে প্রতি ঘনমিটারে সরকারকে ৩০ টাকার উপরে ভর্তুকি দিতে হইতেছে। গ্যাসের সরবরাহ আগামী মাস হইতে আরো বাড়িবে। অথচ গ্যাস চুরি এখনো বন্ধ হইতেছে না, বরং গত কয়েক মাসে বাড়িয়াছে। ফলে একদিকে ভর্তুকিমূল্যে গ্যাস আসিতেছে, অন্যদিকে সিস্টেম লসের (অপচয়) নামে তাহা চুরি হইতেছে। ফলে, বত্সরে এই খাতে সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনিতেছে। উপরন্তু অবৈধ সংযোগ ও পুরাতন লাইনের কারণে ঢাকাসহ ইহার আশপাশে গ্যাসের বিতরণব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া আছে। গ্যাস সরবরাহের চাপ বাড়িলে তাহা আরো বিপজ্জনক হইয়া উঠিবে।
২০১৮ সালের আগস্টে এলএনজি হইতে রূপান্তরিত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি তাহাদের ভাসমান টার্মিনাল হইতে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। ২০১৯ সালের মে মাসে একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানও এলএনজি সরবরাহ শুরু করে। দুই টার্মিনালের দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ সক্ষমতা থাকিলেও পাইপলাইন জটিলতায় এতদিন ৬০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয় নাই। তবে, পাইপলাইন স্থাপনের দায়িত্বরত জিটিসিএল বলিতেছে, রূপান্তরিত গ্যাস সরবরাহের জন্য তিনটি পাইপলাইনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে; আগামী মাসের মাঝামাঝি পাইপলাইনগুলি ১০০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হইবে; কিন্তু ঢাকার বিপজ্জনক পুরাতন পাইপলাইন পরিবর্তনের জন্য গৃহীত প্রকল্পটি শুরু হইতেই আরো এক বত্সর সময় লাগিয়া যাইবে। আর বোঝার উপর শাকের আঁটির মতো গ্যাস চুরি তো বন্ধ হয়ই নাই বরং আরো বাড়িয়াছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দৈনিক প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হয়। এই সকল অবৈধ গ্যাসসংযোগ বিচ্ছিন্ন করিলে দৈনিক অন্তত ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি রোধ করা সম্ভব। দুদকের প্রতিবেদনেও তিতাসের দুর্নীতির প্রধান খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হইয়াছে অবৈধ সংযোগকে।
স্পষ্টত, ছিদ্র বন্ধ না করিয়াই ভর্তুকির টাকা ঢালিয়া চলিয়াছে সরকার। একদিকে যেমন পুরাতন সরবরাহব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া আছে, অন্যদিকে সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সংযোগদানের কারণে গ্যাস সরবরাহে ঝুঁকির মাত্রা ও অপচয় উভয়ই বাড়িয়াছে। জনগণের টাকায় অতি উচ্চমূল্যে আমদানিকৃত গ্যাস এইভাবে চোরদের নিকট বিকাইয়া দেওয়াটা দুঃখজনক। বহু বত্সর যাবত্ তিতাসের দুর্নীতি নিয়া কথা হইতেছে। এখন তিতাসের দুর্নীতিবাজ কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সরবরাহ লাইনও পরিবর্তন করা আশু প্রয়োজন।