বর্জ্য থেকে দূরে থাকুন!

শেখ আনোয়ার

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে প্রতিদিন যে বর্জ্য উত্পন্ন হয় তার মোট পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার মেট্রিক টন। পক্ষান্তরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমস্যা-সীমাবদ্ধতা অপরিসীম। প্রতিদিন যেসব বর্জ্য উত্পন্ন হয়, তার মধ্যে  রয়েছে গার্হস্থ্য বর্জ্য, শিল্পকারখানার বর্জ্য, মেডিক্যাল বর্জ্য। এছাড়া পথেঘাটে, বাজারে-স্টেশনে দৈনিক শত শত টন ময়লা-আবর্জনা তৈরি হয়ে থাকে। এইসব বর্জ্যের মধ্যে অপচনযোগ্য ও রাসায়নিক বর্জ্য পরিবেশের জন্য অধিকতর ক্ষতিকর। দেশে ক্লিনিক-হাসপাতালের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়ে চলছে। হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারসমূহে প্রতিদিন যে বর্জ্য উত্পন্ন হয়, তার বেশির ভাগই আশপাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আশপাশের রাস্তায়, নর্দমায় চিকিত্সা-বর্জ্যের ছড়ানো-ছিটানো অবস্থাটি দৃষ্টির অগোচর নয়। শিল্পকারখানার বর্জ্য ও ট্যানারির কেমিক্যাল-মিশ্রিত বর্জ্য ইতিমধ্যে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে ময়লা-আবর্জনায় পরিবেশ দূষণের মাত্রা কেবল বেড়েই চলেছে। আবর্জনার উত্কট গন্ধে অনেক স্থানে বাতাস ভারী। নাকে রুমাল  চেপে পথ চলতে হয়। আবর্জনা পড়ে নালা-নর্দমার স্বাভাবিক সঞ্চালন প্রায়শই বাধাগ্রস্ত। ম্যানহোল উপচে ময়লা পানিতে গলিপথ অনেক সময় সয়লাব হয়ে যায়। এতে দুর্ভোগ বাড়ে সাধারণ মানুষের। এর চেয়ে বড়ো কথা, পূতিগন্ধে বাতাস নির্মলতা হারালে, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকলে সেই পরিবেশ স্বাস্থ্যের জন্য যে কতটা হানিকর তা সহজেই অনুমেয়। টনকে টন বর্জ্য-আবর্জনা বিভিন্ন শহরের পার্শ্ববর্তী নদী-খালে পড়ে ডেকে আনছে আরেক বিপর্যয়। চট্টগ্রামে শত শত টন বর্জ্য-আবর্জনায় চঞ্চলা-স্রোতস্বিনী কর্ণফুলী হারাতে বসেছে তার চিরচেনা রূপ। প্রতিদিন এই নদীতে পড়ছে মহানগরীর ময়লা-আবর্জনা এবং শিল্প-কারখানার টনকে টন বর্জ্য। ফলে এই নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে  গেছে। দূষণের মাত্রা এতটাই  বেড়ে গেছে যে, এই নদীতে মাছ ও অন্যান্য জলচর প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও নদীটির এমন অবস্থা  হয়েছে, দেখলে পচা নর্দমা বলে ভুল হয়। এদিকে রাজধানী ঢাকার হূিপণ্ড বলে পরিচিত বুড়িগঙ্গার পানি বিষিয়ে গেছে বহু আগেই। এই নদী এখন প্রাণশূন্য প্রায়। ঢাকার পার্শ্ববর্তী বালু এবং অন্যান্য ক্ষুদ্রাকায় নদী এবং নদী অববাহিকায় পরিবেশ বিপর্যয় মারাত্মক রূপ পরিগ্রহ করেছে। কমপক্ষে ৩৬টি গ্রামের মানুষ দূষিত পরিবেশে যাপন করে চলেছেন ক্লেশকর জীবন। বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব তো আছেই। নিত্যব্যবহারের জন্যও তাদের জীবনে পানির দুষ্প্রাপ্যতা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাটিও নাকি বিষিয়ে গেছে। চাষবাস করাও কঠিন। এসব নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও কম হয়নি। টঙ্গীর তুরাগের পানিও এখন শিল্পকারখানার বর্জ্যে মারাত্মকভাবে দূষিত। আমাদের দেশে একটা সময় ছিল, যখন জালের মতো বিছানো ছিল অসংখ্য ছোটো-বড়ো নদী। সেসব নদীর বেশির ভাগই সংস্কারের অভাবে মজে গেছে। অনেক নদীর শেষ চিহ্নটি পর্যন্ত মুছে গেছে। যেসব নদী এখনো বেঁচে আছে, সেগুলোরও করুণ দশা। একদিকে নদীসমূহের তলা ভরাট হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ময়লা-আবর্জনা পড়ে, শিল্পকারখানার বর্জ্য মিশে পানি দূষিত হয়ে গেছে। মাছ ও জলে বাস করা অন্যান্য প্রাণীর জন্য এই পরিস্থিতি মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে, চারদিকে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য এবং এ কারণে সৃষ্ট দূষিত পরিবেশ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। সম্প্রতি ঢাকায় পরিচালিত এক জরিপ থেকে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রতিটি হাসপাতাল থেকে ছয় টন বর্জ্য নির্গত হয়ে থাকে। এই বর্জ্যের শতকরা ২০ ভাগই নাকি সংক্রামক রোগজীবাণুতে পরিপূর্ণ। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, মাটিদূষণ, শব্দদূষণ, প্ল­াস্টিক বর্জ্য, পানীয় সংকট, গে­াবাল ওয়ার্মিং, জীববৈচিত্র্যের সংকট ইত্যাদি নানা সমস্যা নিয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়, সভা-সমিতিতে আলোচনা হয়, কিন্তু এ ধরনের বর্জ্যের ব্যাপারে মিডিয়ার দায়সারা ভাব এবং পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞান সংগঠনগুলির নিরুত্সাহিত সাধারণ মানুষকে এ ব্যাপারে প্রায় অন্ধকারেই রেখেছে। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের জনগণের কাছে চিকিত্সাজনিত বর্জ্য এখন এক মূর্তিমান বিপদ। কারণ প্রতিদিন টন টন চিকিত্সাজনিত বর্জ্য চলে আসছে বাইরে। ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ। একবার ব্যবহারের জন্য তৈরি চিকিত্সার সরঞ্জাম পুনরায় প্যাকেটবন্দি হয়ে আসছে বাজারে। হাসপাতালের বর্জ্যে মিলবেই হাজার ব্যবহূত ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ও নিডল। কাগজ কুড়ানিরা ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যবহূত ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ও নিডল সংগ্রহ করে বিক্রি করে দেয়। ওগুলোই আবার ধোয়ামোছার পর প্যাকেটবন্দি হয়ে চলে আসে বাজারে। কাগজ কুড়ানিদের সংগ্রহের তালিকায় থাকা প্ল­াস্টিক ক্যাথেটার, রক্তের ব্যাগ ও ইন্ট্রাভেনাস টিউব পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের পর হয়ে যায় শিশুর খাবারের প্যাকেট, দুধের, পাউডার ব্যাগ বা চকোলেটের আবরণ। কাগজ কুড়ানিদের সংগৃহীত ব্যান্ডেজ ও রক্ত পুঁজ মাখা তুলোর ঠাঁই হয় লেপ-তোশক বালিশের মধ্যে। স্বল্প আয়ের লোকজন ও ফুটপাতবাসীরা এইসব শয্যাসামগ্রী ব্যবহার করে। সমস্ত ঘটনার সঙ্গে এই কথাটা যুক্ত হবে যেসব বর্জ্যই জীবাণুমুক্ত না হয়ে হাসপাতাল থেকে বাইরে চলে আসছে। চিত্রটি কি ভয়াবহ নয়?

ডিসপোজেবল সরঞ্জামের ব্যবহার ও আধুনিক চিকিত্সা-পদ্ধতির প্রয়োগ যেভাবে দিন দিন বাড়ছে তাতে এই বর্জ্যের বার্ষিক বৃদ্ধির হার হবে ৪ শতাংশ। দেখা গেছে, মোট চিকিত্সাজনিত বর্জ্যের দশ  থেকে বার শতাংশ হলো সংক্রামক। কিন্তু এই কম পরিমাণ বর্জ্যকে যদি ফেলে দেওয়ার আগে জীবাণুমুক্ত না করা হয় তা জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। এ থেকে ছড়াতে পারে নানা রোগ, যেগুলির মধ্যে এইডস, ভাইরাসঘটিত হেপাটাইটিস, যক্ষ্মা, ব্রংকাইটিস এবং ত্বক ও চোখের রোগ উল্লে­খযোগ্য। বায়োমেডিক্যাল উদ্ভূত সর্বপ্রকার দূষণ পদার্থের উত্স সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিং হোম, ডাক্তারের ক্লিনিক, দন্ত চিকিত্সা ক্লিনিক, ডিসপেনসারি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রাণী সংরক্ষণ গৃহ, প্রাণী নিধনগৃহ, ল্যাবরেটরি, মেডিক্যাল গবেষণা সংস্থাসমূহ, ভ্যাকসিন কেন্দ্র, বায়ো টেকনোলজিক্যাল প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও পালস পোলিও টীকাকরণ কেন্দ্র, সংক্রামক রোগ নির্ণয় কেন্দ্র বা হাসপাতাল, ওষুধ দোকান প্রভৃতি। এই সব সংস্থা থেকে প্রতি বছর প্রচুর বর্জ্য পদার্থ উত্পন্ন হয়। এক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতাল আধা কেজি থেকে চার কেজি বর্জ্য পদার্থ প্রতিদিন প্রতি শয্যায় তৈরি হয়। প্রাইভেট হাসপাতালে আধা কেজি থেকে দুই কেজি, নার্সিং হোমে আধা কেজি থেকে এক কেজি বর্জ্য উত্পন্ন হয়। একটি শহরে মোট বর্জ্য উত্পাদন হয় প্রতিদিন ৪০ টন। এইভাবে শহরাঞ্চলে প্রতিদিন বর্জ্য উত্পন্ন হচ্ছে এবং দূষিত পদার্থের বিশাল পাহাড় সৃষ্টি হয়ে চলেছে। এগুলো ধ্বংস করা জরুরি, নতুবা বিপদের সম্ভাবনা থেকে যায়। যারা দূষণ উত্পাদন, সংগ্রহ, জমায়েত করে ছড়ায়, ব্যবহার করে, পরিচর্যা করে তাদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

চিকিত্সা-বর্জ্যদূষণ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে যদি—ক.দূষণ পদার্থসমূহকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। খ. রাসায়নিক পদার্থের পরিশুদ্ধি করা যায়। গ. ব্যাকটেরোলজিক্যাল ও ভাইরোলজিক্যালে টেস্টের পরিত্যক্ত ক্ষুদ্র জীবাণুকে মাইক্রাওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সি ২৪৫০ ওয়েভ লেনথ ১২.২৪ সেমিতে ধ্বংস করা হয়। ঘ. হাসপাতালের চত্বর বড়ো হলে খুব দূরে বর্জ্য পদার্থ পুঁতে ফেলা হয়। ঙ. অনেক পদার্থের জীবাণুসমূহকে নিষ্ক্রিয় করে ডেলায় পরিণত করা হয়। চ. সিমেন্ট ও অন্যান্য পদার্থের সঙ্গে উক্ত বর্জ্য বায়োমেডিক্যাল পদার্থকে একসঙ্গে গোলা তৈরি করা হয়, এই মিশ্রণের অনুপাত হবে—৬৫ শতাংশ বায়োমেডিক্যাল পরিত্যক্ত, ১৫ শতাংশ চুন বা লাইম, ১৫ শতাংশ সিমেন্ট, ৫ শতাংশ সিমেন্ট। ছ. এইভাবে ডেলা পাকালে সব জীবাণু ও অন্যান্য পদার্থ মিশে গিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। জ. যদি হাসপাতাল বা মিউনিসিপ্যালিটির জায়গা কম থাকে, তখন বর্জ্য পদার্থকে বহু দূরে প্রোথিত করা হয়। মনে রাখবেন, অস্বচ্ছ প্ল­াস্টিক ব্যাগ পুড়িয়ে ফেলতে হবে, শেষে মাটিতে গর্ত করে ছাইসহ পুঁতে দিতে হবে।

ইদানীং পরিবেশ দূষণের একটা বৃহত্ অংশ চিকিত্সা বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সাধারণ নাগরিক এ ব্যাপারে সাহায্য করলে বায়োমেডিক্যাল দূষণের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জনসাধারণ সচেষ্ট হলে এইসব দূষণকে ঠেকানো যাবে।

বর্জ্য উত্পন্ন হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের জীবন, পরিবেশ-প্রতিবেশের স্বার্থে বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন নাগরিকদের সাবধানতা। মনে রাখতে হবে, সর্বসাধারণের সাবধানতার এই বিষয়টি মোটেও উপেক্ষা করার মতো নয়।

n লেখক : বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়