ইশরাকের মিছিলে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ভোটের প্রচারের সময় গোপীবাগে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেনের কর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা ধরে এই সংঘর্ষের মধ্যে এক সংবাদকর্মীসহ দুই দলের ডজনখানেক লোক আহত হয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের    নেতাকর্মী বেশি। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু বলেছেন, বিএনপির এই হামলা সুপরিকল্পিত। এটা নির্বাচন বানচালের ইঙ্গিত বহন করে। অন্যদিকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন বলেছেন, ভয় দেখিয়ে নির্বাচন বানচালের জন্য এই হামলা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাককে অভিযুক্ত করেছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি বলেন, নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতির কূটকৌশল নিয়ে কাজ হচ্ছে না বিএনপির। সন্ত্রাসীদের বের করে এনে ভয়ভীতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।

স্থানীয় বিএনপি কর্মীরা বলছেন, গতকাল দুপুর ১টার দিকে ইশরাক মিছিল নিয়ে গোপীবাগে নিজের বাসার দিকে যাওয়ার সময় সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজের মোড়ে ‘আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা’ তাদের ওপর হামলা করে। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ, ধাওয়া পালটা ধাওয়া ও ঢিল  ছোড়াছুড়ি চলে।  কয়েকটি গাড়ি এ সময় ভাঙচুরের শিকার হয়।

ওয়ারী থানার ডিউটি অফিসার শিলা আকতার বলেন, তারা ৯৯৯ থেকে সংঘর্ষের খবর পান। এরপর সেখানে দ্রুত পুলিশ পাঠানো হয় এবং পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হামলার ঘটনার পরে নিজের বাড়ির সামনে ইশরাক হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচনকে বানচাল করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ হামলা হয়েছে। আমরা হাটখোলা থেকে টিকাটুলি হয়ে আমার বাসার দিকে ফিরছিলাম জনসংযোগ শেষে। আমার বাসা থেকে আমরা মাত্র দুই মিনিট দূরে ছিলাম। আমাদের ফেরার রাস্তার পাশে একটি নির্মাণাধীন বিল্ডিং থেকে আমাদের ওপর আক্রমণ করা হয়।

ইশরাকের কর্মী বিল্লাহ হোসেন, জাহিদ ইকরাম ফয়সলসহ ১৪/১৫ জনকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়। সময় টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান আশরাফুল ইসলাম এ ঘটনায় আহত হয়েছেন। আশরাফুলকে আজগর আলী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তবে ঢাকা মেডিক্যালে যে ১১ জন ভর্তি হয়েছেন তাদের অধিকাংশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। তারা হলেন, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ কর্মী ইয়াসিন আরাফাত রকি (৩০) ও একই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন (৫৬), ওয়ারী থানার সাংগঠনিক সম্পাদক আনিচুর রহমান (৪৮), ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষি ও সমবায় সম্পাদক আমির হোসেন (৫৬), হাশেম মোল্লা (৪০), মোবারক হোসেন (৪৭), আসিফ হোসেন জেমস (৫০), মো. রাসেল (৩০), রমজান হোসেন (৩৫), মশিউর রহমান (৩৬) এবং রেজওয়ানুল ইসলাম রাতুল (২৬)।

আহত সোহরাব হোসেন জানান, তারা আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ফজলে নূর তাপস, কাউন্সিলর রোকন উদ্দিন ও মহিলা কাউন্সিলর লাভলী চৌধুরীর নির্বাচনি মিছিল করছিলেন। মিছিল শেষে সেন্ট্রাল ওমেন্স কলেজের পাশে তাদের নির্বাচনি ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। তখন বিএনপির মেয়র প্রার্থীর সমর্থকরা মিছিল নিয়ে ঐ এলাকায় আসে। এরপর তারা ক্যাম্পে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। সেই ইটের আঘাতে তিনি আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী রোকন উদ্দিন আহমেদ পালটা অভিযোগ এনে বলেন, ‘আমরা ক্যম্পের ভেতরে ছিলাম। হঠাত্ ইশরাকের লোকজন আমাদের নির্বাচনি ক্যাম্পের দরজা ভেঙে আমাদের ওপর হামলা করে। এ সময় ইশরাকের লোকজন আট রাউন্ড গুলি ছোড়ে, তাদের হামলায় আমাদের লোকজন আহত হয়েছে। আমাদের কেউ হামলায় ছিল না।’ এমন অভিযোগের জবাবে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আমরা তো প্রচারণা চালিয়ে মিছিল করছি, ওখানে গুলি কোত্থেকে হবে। আমাদের ওপর ওরা গুলি করেছে।’

ওয়ারী থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) সুদীপ কুমার সাহা বলেন, ‘ইশরাক হোসেনের এই এলাকায় নির্বাচনি প্রচারের কথা ছিল বিকাল ৫টায়। সে অনুযায়ী পুলিশকে তারা একটি চিঠিও দিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাত্ করে তারা দুপুর ১টায় ঐ এলাকায় নির্বাচনি প্রচার শুরু করেন, যা পুলিশকে জানাননি। ফলে পুলিশের কোনো প্রস্তুতি ছিল না।’

সবুজবাগে প্রচারণা চালানোর সময় হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস সাংবাদিকদের বলেন, তারা ভয়ভীতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দায়ের করা হবে।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু বলেছেন, বিএনপির কোনো প্রচারণা করার শিডিউল প্রোগ্রাম ছিল না। এ ধরনের কোনো শিডিউল প্রোগ্রাম তাদেরকে আগে জানানো হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যে এটা পরিষ্কার, এটা তাদের একটা সুপরিকল্পিত ঘটনা। এটা আগামী দিনে নির্বাচন বানচালের একটি ইঙ্গিত। গতকাল বিকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। দুপুরে হামলার ঘটনার পর জরুরি বৈঠকে বসে নির্বাচন পরিচালনা সংশ্লিষ্ট নেতারা। রাজধানীর টিকাটুলি এলাকার অভয়দাস লেনে নৌকার প্রার্থীর নির্বাচনি ক্যাম্পে হামলার ঘটনা তুলে ধরে আমির হোসেন আমু বলেন, তারা গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসছে, গণতান্ত্রিক ধারা সুষ্ঠুভাবে চলবে এটাই আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু নির্বাচনি প্রচারণায় তারা যখন থেকে অনির্বাচনের ধারার ব্যাপারে কথাবার্তা বলা শুরু করল। তারা স্বপ্নে দেখা শুরু করল নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, অবাধ হবে না, নিরপেক্ষ হবে না। তারা বলা শুরু করল, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ হতে পারে। এই সমস্ত কথাবার্তার মধ্য দিয়েই আমরা একটু আঁচ করতে পারছিলাম, তারা আসলে নির্বাচন বানচাল করবে। অবশেষে আজকে তারই একটি বহিঃপ্রকাশ, দুঃখজনকভাবে আমরা লক্ষ্য করলাম।