মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ কঠোর রাজপরিবারতান্ত্রিক ব্যবস্থার দেশ ওমানের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব গভীর। গত ১০ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময়ের শাসক ওমানের সুলতান কাবুস বিন সাইদ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে শোকাহত বন্ধু বাংলাদেশ এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করে। সুলতান কাবুসের এই মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যপন্থা কূটনীতিতে এক শূন্যতা তৈরি করেছে।
ওমানের মুসলমানরা মূলত ইবাদি সম্প্রদায়ের। এরা শিয়া ও সুন্নি থেকে আলাদা। কোরাইশ বংশ থেকে বারবার খলিফা নির্বাচনের ফলে নিজেরা বঞ্চিত হচ্ছে দাবি করে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম বিদ্রোহ করে আলাদা হওয়া গোষ্ঠী ইবাদিরা। ইবাদিরা নিজেদের সরল মুসলমান দাবি করে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের দেখা হয় অবজ্ঞার চোখে। কিন্তু ওমানিরা বন্ধুবত্সল। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা তাই ওমানে ভালো সফল। এই বছরই সাত জন ওমান প্রবাসী বাংলাদেশি প্রবাসী ক্যাটাগরিতে সিআইপি মর্যাদা জিতেছেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার যখন বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় বন্ধ তখনো খোলা ছিল ওমানের দুয়ার। ফলে ওমান হয়ে ওঠে বাংলাদেশিদের পছন্দের দেশ।
সদ্য প্রয়াত সুলতান পড়াশোনা করেছেন ভারত ও জার্মান থেকে। আধুনিক মনস্ক তরুণ কাবুস ১৯৭০ সালে তার বাবাকে হটিয়ে ওমানের সিংহাসনে বসেন। ক্ষমতায় আরোহণ করেই তিনি ওমানের তেলসম্পদকে ব্যবহার করে ওমানকে অন্যতম ধনী দেশে পরিণত করেছেন। অন্যদিকে নিজের ক্যারিশমায় বিশ্বরাজনীতির অন্যতম সমঝোতাকারী খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। শিয়া সুন্নি থেকে স্বতন্ত্রবোধ ওমানকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সমঝোতাকারীতে পরিণত করেছে। বাবা-মায়ের একমাত্র পুত্র কাবুস ১৯৭৬ সালে বিয়ে করেন তার চাচাতো বোনকে। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ায় কাবুসের কোনো উত্তরসূরি নেই। সুলতান কাবুসের মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া গোপন চিঠি মতে ওমানের সিংহাসনে বসেন তার চাচাতো ভাই হাইতাম বিন তারেক আল সাইদ। কাবুসের মৃত্যুতে শোক জানাতে ও নতুন সুলতানকে বরণ করতে ওমানে উড়াল দেন প্রিন্স চার্লস, কাতারের আমির আর ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
নিরপেক্ষ ও ভারসাম্য কূটনীতির জন্য সুলতান কাবুস এক বিস্ময়। ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির পরমাণু শান্তিচুক্তি স্থাপনের জন্য ২০১৩ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে চুক্তি বাস্তবায়নে পথ মসৃণ করেছেন সুলতান কাবুস। এছাড়া ইরানের সঙ্গে জিসিসিভুক্ত দেশ ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনের সমঝোতার নায়কও সুলতান কাবুস। এমনকি ২০১৭ সালে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিশর কাতারের ওপর অবরোধ আরোপে সৃষ্ট সংকটে ওমান তার নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছে। এমনকি বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার জন্য আলোচনা চালিয়েছেন। ‘কোনো শত্রু নেই, সবার সঙ্গে বন্ধুত্বে’ বিশ্বাসী ওমানের সঙ্গে বিশ্বের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ দেশের উষ্ণ সম্পর্ক। তবে ২০১০ সালে কয়েকজন আরব আমিরাত নাগরিকের বিরুদ্ধে ওমানের সুলতানকে উত্খাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছিল। ফলে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয় দুই দেশের মধ্যে। পরে অবশ্য কুয়েতের আমিরের মধ্যস্থতায় দুই দেশ সম্পর্কে ফের উন্নতি ঘটায়।
সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংকটেও এগিয়ে এসেছিলেন সুলতান কাবুস। পাঁচ বছর ধরে চলমান এই যুদ্ধ বন্ধে গত বছরের নভেম্বরেও তিনি দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সুলতান কাবুস যখন পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন তখন যুদ্ধে দামামা বাজছিল মধ্যপ্রাচ্যে। এই সংকটে পৃথিবী শূন্যতা অনুভব করে সুলতান কাবুসের। চলমান ইরান-মার্কিন উত্তেজনা প্রশমনে কাতার এগিয়ে আসলেও এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার সৌদি আরব, আরব আমিরাত—যাদের সঙ্গে কাতারের সম্পর্ক সৌহার্দ্যপূর্ণ নয়। ফলে বিশ্ব শূন্যতা অনুভব করে নিরপেক্ষ কূটনীতির রহস্যপুরুষ সুলতান কাবুসের।
ওমানের নতুন সুলতানের সামনে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ওমান অর্থনৈতিক পরিকল্পনা-২০৪০ বাস্তবায়ন। তেলের বাজারদর পড়ে যাওয়ার পর ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় বাজেট জোগান নিয়ে দুশ্চিন্তায় ওমান। ফলে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও পর্যটন বিকাশের পরিকল্পনা নিয়েছে ওমান সরকার। সুলতান কাবুসের আরেক চাচাত ভাই আসাদ বিন তারিক তার সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন এমনকি তিনি সামরিকভাবেও বেশ দক্ষ। কিন্তু উত্তরাধিকারী হিসেবে হাইতামে বিন তারিকের নাম রেখে যাওয়াকে সুলতান কাবুসের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে প্রাধান্য দেওয়ার ভাবনা ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকরা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও আবুধাবি ক্রাউন্স প্রিন্স জায়েদ বিন নাহিয়ানের মতো আসাদ বিন তারেক বর্তমান সুলতানের চেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
বর্তমান সুলতানের জন্য আরেকটি বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে মুয়ান্ডাম উপদ্বীপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। হরমুজ প্রণালির মুখে অবস্থিত এই উপদ্বীপ ওমানের মূল ভূখণ্ড থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্বারা প্রায় ৮০ কিলোমিটার বিচ্ছিন্ন। ১৯৯০ সাল থেকে এখানে সামরিক উপস্থিতি থাকলেও অনুন্নত এই দ্বীপে বসতি নেই তেমন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনায় এই দ্বীপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নতুন সুলতানের জন্য হয়ে উঠবে চ্যালেঞ্জ। এছাড়া নিজ ক্যারিশমায় তার পূর্বসূরি সুলতান কাবুস যে কূটনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করেছেন তা তিনি কতটা ধরে রাখতে পারবেন তার দিকে নজর রাখবে বিশ্ব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়