মেয়র নির্বাচিত হতে পারলে দুই বছরের মধ্যেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি) আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। আগামী শনিবার অনুষ্ঠেয় ভোটের চারদিন আগে গতকাল সোমবার রাজধানীর ডেমরায় গণসংযোগের সময় ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে নিজের এই পরিকল্পনার কথা জানালেন ঢাকা দক্ষিণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত এই মেয়র প্রার্থী। করপোরেশনকে সত্যিই আর্থিকভাবে সক্ষম করতে পারবেন? পালটা এই প্রশ্নের জবাবে দুই ঠোঁট চাপিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বৃদ্ধাঙ্গুল উঁচিয়ে বললেন, ‘ইনশাল্লাহ, দুই বছরের মধ্যেই করব’।
ঢাকার আগের মেয়রদের প্রায় প্রত্যেকেই সিটি করপোরেশনের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে কথা বলেছেন। মেয়র প্রার্থী হিসেবে আপনিও নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, কিন্তু করপোরেশনের যে আয় এবং বরাদ্দ তা দিয়ে কি এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন আদৌ সম্ভব? জানতে চাইলে শেখ তাপস বলেন, এটা ঠিক সিটি করপোরেশনকে সরকারের অনুদানের ওপরই মূলত নির্ভর করে চলতে হয়। আমার পরিকল্পনা আছে, সরকারের অনুদানের পাশাপাশি করপোরেশনের নিজস্ব আয় বাড়ানোর। কীভাবে সেই আয় বাড়ানো যায়, সেটিরও পথ খুঁজে বের করব, সেই পরিকল্পনা আমার মাথায় আছে। করপোরেশনের আয় বাড়ানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। আয় বাড়াতে হলে কেবলমাত্র নাগরিকদের হোল্ডিং ট্যাক্স বা কর বাড়াতে হবে তা কিন্তু নয়। বরং রাজস্ব আহরণের অন্য দিকগুলোতে আমি নজর দেব। এটা বলতে পারি, আমি মেয়র নির্বাচিত হলে সমন্বয়ের মাধ্যমে বরং কিছু ক্ষেত্রে নাগরিকদের কর কমতে পারে।
ডেমরার হাজীনগর স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় দক্ষিণ সিটির ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডে দুপুরে গণসংযোগের ফাঁকে-ফাঁকে ‘নৌকা’ প্রতীকের প্রার্থী শেখ তাপস কথা বলেন ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধির সঙ্গে। প্রশ্ন ছিল—নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? তাপসের এক শব্দের জবাব, ‘ভালো’। আপনার মনে হয় প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে? তার জবাব, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড অবশ্যই রয়েছে। সব প্রার্থীই প্রতিদিন নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালাচ্ছেন। আমাদের প্রতিপক্ষ শুধু অভিযোগ করার জন্যই অভিযোগ করছেন। এটা তাদের নির্বাচনি কৌশল হতে পারে। কিন্তু শুধু অভিযোগ না করে প্রত্যেক প্রার্থীরই উচিত ঢাকা সিটির জন্য নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরা। এরপর মূল্যায়নের ভার ভোটারদের উপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত, ভোটাররাই তাদের মেয়র নির্বাচন করবেন।
আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন রবিবার তার প্রচারণায় হামলার অভিযোগ করেছেন। এর জবাবে শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, এটা একটা অনভিপ্রেত ঘটনা। ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডে একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর সঙ্গে কীভাবে একজন মেয়র প্রার্থী সংঘাতে যায়! সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতে এটা ষড়যন্ত্র কি-না এখন সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমার জানা মতে, ঐ এলাকায় বিএনপির প্রার্থীর প্রচারণার সময়সূচি ছিল বিকাল ৫টায়। কিন্তু ইশরাক হোসেন সদলবলে সেখানে যান দুপুর ১টায়।
ডিএসসিসিকে নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কি, একবাক্যে বলতে বললে কি বলবেন? শেখ তাপসের জবাব, ‘উন্নত ঢাকা গড়তে চাই।’ কীভাবে উন্নত ঢাকা গড়বেন? এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিস্তারিত তুলে ধরে বললেন, যে ঢাকাতে হারিয়েছি আমার পিতা-মাতাকে, কাটিয়েছি শৈশব এবং কৈশোরের দিনগুলো। পড়াশোনা, খেলাধুলা আর অড্ডায় মেতেছি বন্ধুদের নিয়ে, বেড়ে উঠেছি, আবদ্ধ হয়েছি বিবাহবন্ধনে—আজ বৃহত্ পরিসরে সেই ঢাকাবাসীর সেবার লক্ষ্যেই মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছি। ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নাগরিকদের মৌলিক সুবিধা ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী ঢাকাবাসীর জন্য বৃহত্ পরিসরে কাজ করা ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
‘উন্নত ঢাকা’র পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই উন্নত বাংলাদেশের উন্নত রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তুলতে হবে। তাই ঢাকাবাসীর জন্য উন্নয়নের পাঁচটি রূপরেখা তৈরি করেছি। এগুলো হচ্ছে ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা, সচল ঢাকা ও উন্নত ঢাকা। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ধরে রেখেই উন্নত রাজধানী গড়তে ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রতিটি উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের মান নিরূপণ করে অন্তত ১০ বছর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
‘সুন্দর ঢাকা’ গড়ার প্রতিশ্রুতির বিষয়ে শেখ তাপস বলেন, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা দুই নদীর অববাহিকায় পত্তন হওয়া এমন শহর পৃথিবীতে বিরল। সুন্দর ঢাকা গড়তে সবুজায়ন, পরিবেশবান্ধব স্থাপনা বৃদ্ধি ও বায়ুদূষণ রোধে কার্যকরব্যবস্থা গ্রহণ করব। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন, প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ নিশ্চিত করা, নারী-শিশু ও প্রবীণদের জন্য হাঁটার উন্মুক্ত স্থান তৈরি করব। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার পাড় ঘিরে বনায়ন, বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনসহ ব্যাপক সৌন্দর্য বর্ধনের মাধ্যমে সুন্দর ঢাকা গড়তে চাই। সব সড়ক ২৪ ঘণ্টা আলোকিত রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
‘সচল ঢাকা’ বলতে কী বোঝোতে চাচ্ছেন? ফজলে নূর তাপসের জবাব, যানজটের কারণে রাস্তায় চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো ও ফিরে আসতে নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয়। বিশেষ করে, কর্মজীবী নারীদের বিড়ম্বনা অপরিসীম। গণপরিবহনের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কিছু রাস্তায় দ্রুতগতির যানবাহন, কিছু রাস্তায় ধীর গতির যানবাহন, আবার কিছু রাস্তায় শুধু মানুষের হাঁটার ব্যবস্থা করব। দ্রুতগামী যানবাহনের জন্য থাকবে আলাদা পথ, থাকবে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা।
‘সুশাসিত ঢাকা’ সম্পর্কে এই মেয়র প্রার্থী বলেন, ঢাকায় একসময় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ছিল। মাদক নির্মূলসহ এলাকাভিত্তিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা কার্যকর করব। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন হবে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত সংস্থা। মশকের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস, মশক নিধস ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে দৈনন্দিন ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতি সম্প্রতি ডেঙ্গু নিয়ে নগরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মশক নিধনে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, মশকনিধন কার্যক্রম অত্যাবশ্যকীয় সেবা, এটি প্রতি দিন চালানো হবে। প্রতি ঘণ্টা নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা হবে। মেয়র হতে পারলে উন্নয়নের জন্য কোনো টাইমফ্রেম ঠিক করবেন কি না, প্রশ্ন করা হলে তাপস বলেন, নাগরিক সব মৌলিক সেবা ৯০ দিনের মধ্যেই নিশ্চিত করব ইনশাল্লাহ।
প্রচারণায় ভোটারদের কেমন সাড়া পাচ্ছেন, জয়ী হবেন, কী মনে হয়? এর জবাবে শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, যেখানেই যাচ্ছি প্রচুর সাড়া পাচ্ছি। আমরা উন্নত ঢাকা গড়ার যে কথা বলছি ভোটাররা তা গ্রহণ করছেন। বিপুল ভোটে জয়ী হব, এ ব্যাপারে আমি দৃঢ় আশাবাদী।