তিন বানিয়াকন্যা ও ছয় নদীর গল্প ‘জলবাসর’

প্রথমবারের মতো মঞ্চে উঠল মাসুম রেজার রচনা ও নির্দেশনায় দেশ নাটক-এর ২৩তম প্রযোজনা ‘জলবাসর’। ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় তিন বানিয়াকন্যার গল্প শোনালেন প্রখ্যাত এই নাট্যকার। গল্প মঞ্চে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই রচিত হলো আরেক গল্প। থিয়েটারের যে কত শক্তি, কী প্রবল টান, তার সবটা প্রয়োগ করে দেখালেন দেশ নাটকের স্বজন হারানো শোকাহত কর্মীরা। চোখে ছলছল জল, বুকভরা হাহাকার নিয়ে সেদিন সবটা নিংড়ে দিলেন অভিনেত্রী নাজনীন হাসান চুমকি, বন্যা মির্জা ও সুষমা সরকার। যা অনেকদিন মনে রাখবেন দর্শকেরা। গল্পপাঠ থেকে শুরু করে নাটকটি মঞ্চায়নের বিশাল কর্মযজ্ঞ নিজ হাতে শেষ করে উদ্বোধনী মঞ্চায়নের মাত্র ৫ দিন আগে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন দলটির প্রধান ইশরাত নিশাত। শোকাহত কর্মীরা ‘প্রিয় নিশাত আপা’র চাওয়া পূরণ করতে কালবিলম্ব না করে সিদ্ধান্ত নেন পূর্ব নির্ধারিত দিনেই হবে উদ্বোধনী মঞ্চায়ন। নাটকের জন্য নিবেদিত প্রাণ ইশরাত নিশাত বলেছিলেন, ‘আমার মৃত্যু হলেও দেশ নাটকের স্বপ্ন থামবে না।’ সেই ব্রতকে সামনে রেখে সাহস দেখায় দেশ নাটক। নির্ধারিত সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির অঙ্গনে দুটি আবহ স্পষ্ট ছিল। ইশরাত নিশাতকে হারানোর শোকে আচ্ছন্ন শিল্পকলার প্রতিটি প্রাঙ্গণ। অন্যদিকে দর্শকদের মাঝে উচ্ছ্বাস-আনন্দ নতুন নাটক ঘিরে। দেশ নাটকের কর্মীদের শোকাহত ভারি কণ্ঠে আওড়াতে হবে রোমান্টিক সুর অথবা প্রবল হাসির কোনো সংলাপ! যা এক বিস্ময়কর চ্যালেঞ্জ ছিল কর্মীদের জন্য। বলতেই হবে, সেই চ্যালেঞ্জে দারুণভাবে উের গেছেন সবাই। কী এক প্রবল শক্তি নিয়ে সেদিন মঞ্চে এসেছিলেন সবাই, তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করাও কঠিন! নাটকটি বলে, চান্নিপসর ও ডুবুদহ গ্রামের তিন বানিয়াকন্যা ও ছয় নদীর গল্প। যে গল্প শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে পুরো পৃথিবীর গল্প। আর সেই পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার নীরব দায় পালন করে তিন বানিয়াকন্যা হয়ে ওঠে প্রকৃতিরই অংশ। মানুষ তার চারপাশের জল, জঙ্গল, মাটি, গিরিশৃঙ্গ ধ্বংস করতে করতে কোন বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেই আখ্যানই বিম্বিত হয়েছে জলবাসরের পরতে পরতে। জাদু বাস্তবতার আশ্রয়ে অতীত-বর্তমানের মধ্য দিয়ে ভবিষতের মগজ বাস্তবতাকে টেনে এনেছেন নাট্যকার মাসুম রেজা। পৃথিবী আকৃতি ছয়তলা মঞ্চের খুঁটিগুলো কিছুটা জড়তা সৃষ্টি করলেও অভিনয়শিল্পীদের নৈপুণ্যে সেখানেও সফল দেশ নাটকের জলবাসর। কস্টিউম ও আলোক পরিকল্পনাতেও ছিল নান্দনিকতার ছাপ। রেকর্ডিং আবহসংগীত গল্পের গাঁথুনির মধ্যে কিছুটা খাপছাড়া মনে হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো বা সেখানেও গুছিয়ে উঠতে সক্ষম হবে দেশ নাটক। নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন কামাল আহমেদ, ফিরোজ আলম, সেলিনা শেলী, খায়রুল আনাম জোয়ার্দার, ফাহিম মালেক ইভান, মাইনুল হাসান মাঈন, কুদ্দুস মাখন, রোশেন শরিফ, কাজী লায়লা বিলকিস, হোসেইন নিরব, লরেন্স উজ্জ্বল গমেজ, সুষ্মিতা সাহা, তামিমা তিথি, সুজন রায়, ইব্রাহীম হোসাইন, আবিদুর রহমান আদর, গোলাম মাহমুদ, সালমান লিমন, সাগর দাস, লেতুনজেরা নীলা, আল আমিন ও পলাশ মণ্ডল।