পকেটবিহীন পোশাক

দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের বিড়ম্বনা, মূল্যবান মালামাল খোয়া যাইবার ঘটনা নূতন নহে। পূর্বে ইহার প্রাদুর্ভাব এতটাই বেশি ছিল যে, অনেকে দেশে আসিবার ব্যাপারে আতঙ্কিত হইয়া পড়িতেন। এখন অবস্থা উন্নয়নে কর্তৃপক্ষ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে। অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, কর্মরত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা তাহাদের নিজ দায়িত্বে সিসি ক্যামেরা বসাইয়াছে; কিন্তু খুব বেশি সফলতা এখনো আসে নাই। এইবার চোখে পড়িবার মতো একটি উদ্যোগ লইয়াছে কর্তৃপক্ষ। ইত্তেফাকের এক সংবাদ হইতে জানা গিয়াছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ কাটা রোধ করিতে কর্তৃপক্ষ লোডারদের, অর্থাত্ যাহারা মালামাল খালাস করিয়া বহন করিবার কাজে নিয়োজিত তাহাদের পকেটবিহীন পোশাক পরিয়া কর্মস্থলে আসা বাধ্যতামূলক করিতেছেন। কতটা ফলাফল পাওয়া যাইবে তাহা বোঝা না গেলেও ইহাতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, কর্তৃপক্ষ এই লাগেজ ও মালামাল চুরির ব্যাপারে খানিকটা হইলেও উদ্বিগ্ন।

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন ভিন্ন জায়গায়। এই ধরনের কর্মে কি শুধু লোডাররাই নিয়োজিত? বিমানে কি কেবল যাত্রী ও লাগেজই আসিয়া থাকে? আর বিমানবন্দরের সমস্যা কি কেবল লাগেজ হইতে মালামাল চুরি? মোটেই তাহা নহে। বহু রকমের সমস্যা লইয়া চলিতেছে এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি। ইমিগ্রেশনে হয়রানি, কাস্টমস চেকিংয়ে ‘মালপানি’র কারবার আমাদের বিমানবন্দরের সুনাম ক্ষুণ্ন করিতেছে বহুকাল ধরিয়া। সুতরাং বিমানবন্দরকে ‘পরিচ্ছন্ন’ করিতে হইলে সকল দিকে সমান হারে নজর দেওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত এই আধুনিক যুগে পকেট থাকা বা না থাকার চাইতে সিস্টেম বা পদ্ধতির দিকে নজর দেওয়া অধিক প্রয়োজন। যেমন বিমান হইতে লাগেজ বেল্ট পর্যন্ত মেকানাইজড করিয়া ফেলা প্রয়োজন। ইহার পাশাপাশি সর্বত্র সিসি ক্যামেরা সম্প্রসারণ করা যাইতে পারে।

এই উপমহাদেশ ছাড়া সভ্য দুনিয়ার সর্বত্রই একটা সিস্টেম আছে। ভি এস নাইপল তাহার ‘অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস’ বা ‘অন্ধকার অঞ্চল’ গ্রন্থের শুরুতেই বর্ণনা করিয়াছেন এই অঞ্চলের বিভিন্ন বন্দরের প্রকৃত চিত্র; কী করিয়া মানুষকে হয়রানির শিকার হইতে হয় সেই সকল দিক। বাহ্যিক অসৌন্দর্যের  চাইতেও আমাদের এই সকল স্থানে বড়ো হইয়া ধরা পড়ে মানবিক মূল্যবোধের অভাব, দায়িত্বে অবহেলা, অর্থলোভে যাত্রী হয়রানির মতো বিষয়গুলি। আমাদের বিমানবন্দরকে পরিচ্ছন্ন করিতে হইবে সেই অর্থে। আমরা মনে করি, নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ঠিক হইয়া আসিবে। তবে এখনো কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। মানুষের দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রধান উত্স হইল অনটন বা অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। মানুষের যখন আরো অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হইবে, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক অবস্থা পালটাইয়া যাইবে তখন আত্মসম্মানের কারণেই নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি বড়ো অংশ আর দুষ্কর্মের সহিত থাকিবে না। আমরা জানি, গোটা বাংলাদেশই বিমানবন্দরের মতো হইয়া আছে। ফলে দেশে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাইতে হইবে। তাহা হইলেই আর কাহাকেও পকেট ছাড়া জামা পরিয়া কাজে যোগ দিতে হইবে না।