কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ প্রসঙ্গ

মানবসভ্যতায় কৃষির ভূমিকা আদি ও অপরিহার্য। আনুমানিক ৯৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে কৃষির উদ্ভব হইতে শুরু করিয়া অদ্যাবধি সভ্যতার চালিকাশক্তি হইল কৃষি। যাযাবর জীবন হইতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু এবং সভ্যতা নির্মাণ সম্ভব হইয়াছিল কৃষির কারণে। আধুনিক বিশ্বের প্রথম শিল্পবিপ্লবও ছিল মূলত কৃষির আধুনিক বিপ্লব। তাহার পর পৃথিবী কয়েকটা প্রযুক্তিগত শিল্পবিপ্লব দেখিয়াছে। বিশ্বের অর্থনীতি কৃষি হইতে সরিয়া শিল্প উত্পাদনের দিকে ঝুঁকিয়াছে কিন্তু কৃষির গুরুত্ব থাকিয়া গিয়াছে। বিশেষ করিয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো অনেকাংশে কৃষির উপর নির্ভরশীল। মোট দেশজ উত্পাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বাংলাদেশ জনবহুল দেশ; সীমিত আয়তনের কারণে কৃষিজমির পরিমাণও কম। ইহার পরও বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যচাহিদা এই দেশকে মিটাইতে হয়; ফলে কৃষিতে নূতন প্রযুক্তি ব্যবহার ও উদ্ভাবনের বিকল্প নাই। এই ক্ষেত্রে আমাদের সামনে উদাহরণ হিসাবে আছে কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহার করা উন্নত দেশগুলি। তাহারা কৃষি গবেষণাতেও প্রচুর বিনিয়োগ করিয়া থাকে। আমরা পিছাইয়া আছি। কৃষি গবেষণায় আমাদের বরাদ্দ অপ্রতুল। সম্প্রতি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিটের (এফপিএমইউ) ‘মনিটরিং রিপোর্ট ২০১৯ অব দ্য বাংলাদেশ সেকেন্ড কান্ট্রি ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান’ প্রতিবেদনে কৃষি গবেষণায় অপ্রতুল বরাদ্দের বিষয়টি উঠিয়া আসিয়াছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয় ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ সিস্টেমভুক্ত (নার্স) গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য। প্রয়োজনের তুলনায় ইহা যে অপ্রতুল তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না।

বাংলাদেশে কৃষিতে চ্যালেঞ্জ বাড়িতেছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একদিকে মরুকরণ ছড়াইতেছে অপরদিকে সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়িতেছে। পাশাপাশি একই জমি বারবার ব্যবহার করার কারণে স্বাভাবিক নিয়মে উহার উর্বরতা কমিতেছে। চাহিদা মিটাইতে বহুমুখী ফসল উত্পাদনের দিকে মনোযোগী হইতে হইতেছে কৃষককে। আছে কীটপতঙ্গের আক্রমণের আশঙ্কা। পাশাপাশি চিনি, ডাল, মসলা ও তেলজাতীয় পণ্যের চাহিদার সিংহভাগই পূরণ করিতে হইতেছে আমদানির মাধ্যমে। শুধু এই চারটি পণ্য আমদানিতেই প্রতি বছর গড়ে ব্যয় হইতেছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, জাত উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশেই উত্পাদন করা সম্ভব এইসব পণ্য। এইজন্য প্রয়োজন উচ্চতর গবেষণা। ফলে কৃষির উন্নতি ও সম্প্রসারণের জন্য গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়াইতে হইবে। খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল জাত আমাদের উদ্ভাবন করিতে হইবে। ফসলের বৈচিত্র্য আনিতে হইবে। এইজন্য কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নও ঘটাইতে হইবে। নূতন নূতন গবেষক তৈরি করিতে হইবে। আমাদের যেহেতু বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা আগামী দশকগুলিতেও মিটাইতে হইবে, তাই কৃষির উপর নির্ভরশীলতা আমাদের কমিবে না। দানাদার ও অন্যান্য খাদ্য উত্পাদনে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে সফলতা দেখাইয়াছে। এখন বহুমুখী পুষ্টিচাহিদা পূরণ করিতে ও খাদ্যদ্রব্য উত্পাদনে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বাংলাদেশকে কৃষি গবেষণায় আরো গুরুত্ব প্রদান করিতে হইবে।