চলতি একাদশ জাতীয় সংসদ এক বছর পূর্ণ করছে আজ। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর গত বছরের ৩০ জানুয়ারি প্রথম বৈঠকের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে একাদশ সংসদ। এই এক বছরে সবচেয়ে বেশি দুঃখজনক ঘটনা ছিল সাত জন সংসদ সদস্যের ইন্তেকাল। এ সময় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত বিএনপির ছয় জন এবং গণফোরামের দুই জন সংসদ সদস্যের সংসদে যোগদান। বিভিন্ন ইস্যুতে মাঝেমধ্যে সংসদে উত্তাপ ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন বিএনপির এমপিরা। আর প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) এই এক বছরে কার্যত নিজেদের কলহেই পুড়েছে বেশি।
একাদশ সংসদের প্রথম বছরের পর্যালোচনায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, “সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকার কোনো উপাদান এ সময়ে জাপার মধ্যে দেখা যায়নি। এ অবস্থা থেকে দলটির উত্তরণেরও কোনো লক্ষণ আমরা দেখছি না। বরং বিএনপির এমপিরা সংসদে গিয়ে কিছুটা তর্কবিতর্কের মাধ্যমে হলেও ‘মূল’ বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে।”
একাদশ সংসদ গঠনের পর প্রথম আলোচনাই ছিল বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত আট জন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করে সংসদে যাবেন কি যাবেন না। নানা নাটকীয়তা শেষে প্রথমে গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, এরপর দলটির আরেক এমপি মোকাব্বির খান দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সংসদে যান। এরপর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া দলটির বাকি পাঁচ জনও শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন। পরে ফখরুলের আসনে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপির জি এম সিরাজও সংসদে যান। আনুপাতিক হারে প্রাপ্ত একটি সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসেন বিএনপির ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাও।
সংসদে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বিএনপির এমপিরা তখন বলেছিলেন, সংসদে গিয়ে তারা দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বলবেন। মাঝেমধ্যে তার মুক্তির কথা সংসদে তুলেছেনও বিএপির একাধিক এমপি। এছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতেও পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলেছেন তারা। এর মধ্যে এই এক বছরে এক দিন সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন বিএনপির এমপিরা।
সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে এক বছর পার করেছে এইচ এম এরশাদের রেখে যাওয়া দল জাপাও। জাতীয় রাজনীতির কোনো ইস্যুতে তেমন আলোচনায় না এলেও বছর জুড়েই জাপা খবরের শিরোনাম হয়েছে অভ্যন্তরীণ বিবাদের কারণে। দলের নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে বছরব্যাপী অভ্যন্তরীণ দলাদলি আর মতবিরোধ লেগেই ছিল দলটিতে।
বিরোধী দল হিসেবে জাপার ভূমিকা নিয়ে কারো কারো সমালোচনার জবাবে জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেছেন, ‘আমরা সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি। আর বিরোধী দল মানেই সংসদে হইচই, গালাগাল কিংবা ফাইল ছুড়ে মারা নয়। আমরা গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছি।’
দলটির কো-চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু ইত্তেফাককে বলেন, ‘আগের সংসদে জাপা সরকারের মন্ত্রিসভার পাশাপাশি বিরোধী দলেও ছিল, সেজন্য আমাদের ইমেজ সংকট ছিল। এই সংসদে আমরা শুধু বিরোধী দলে রয়েছি। এর মধ্য দিয়ে ইমেজ সংকট কাটানোর চেষ্টা করছি আমরা।’ তাছাড়া দুর্নীতি, ধর্ষণসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জাপার এমপিরা সংসদে কথাও বলেছেন।
এদিকে চলতি একাদশ সংসদ প্রথম বছরেই হারিয়েছে সাত জন সদস্যকে। নির্বাচনের কয়েক দিন পরেই গত বছরের ৩ জানুয়ারি ইন্তেকাল করেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। আর গত বছরের ১৪ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন এই সংসদের সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা ও জাপার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। এরপর বাংলাদেশ জাসদের মইনউদ্দীন খান বাদল এবং আওয়ামী লীগের ডা. ইউনুস আলী সরকার, ডা. মোজাম্মেল হোসেন, ইসমাত আরা সাদেক ও আবদুল মান্নান ইন্তেকাল করেন।