সন্তানের মন বুঝুন

মুহাম্মদ হাসান মাহমুদ ইলিয়াস

মনে পড়ে বাদশা আলমগীরের কথা যিনি তার ছেলে কেন শিক্ষকের পা ধুয়ে দিলো না তার জন্য শিক্ষককে তার দরবারে ডেকে নিয়েছিলেন। শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চেয়ে তিনি শিক্ষকের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছিলেন। শিক্ষক শাসন করবেন আবার ভালোবেসে কাছে টেনে নিবেন এটিই স্বাভাবিক। আমরা জীবনে কত বেতের পিটুনি, খেজুরের লাঠির পিটুনি, বাঁশের পিটুনি খেয়েছি, কান ধরে বেঞ্চের নিচে মুরগি হয়ে বসে রয়েছি, হাতের আঙুলের মধ্যে কলম রেখে আঙুলে চাপ দেওয়ার মতো অসহ্য যন্ত্রণা পেয়েছি তা আমরা  জানি যারা গ্রামের স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছি। কিন্তু আমরা কখনো আত্মহত্যা করিনি।

আমাদের শিক্ষকদের শিক্ষকরা ছিলেন আরও ভয়ঙ্কর। আমাদের শিক্ষকরা বলত, তাদের শিক্ষকরা  নারিকেলের খোসা সূঁচের মতো সূঁচালো করে তার ওপর এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখত পড়া না পারলে। এমনকি একবার পরীক্ষা দেওয়ার দিন কলম কেনায় তিন চারটি খালের মিলনস্থল-যেখানটা খরস্রোতা সেখানে নৌকায় যাওয়ার পর শিক্ষক ঠেলে ছাত্রকে খালে ফেলে দেন। কারণ পরীক্ষার দিন কলম কিনলে তা দিয়ে ভালোভাবে এবং দ্রুত লেখা যায় না লেখা বেঁধে পড়ে। যা শিক্ষক আগেই বলেছিলেন কিন্তু ছাত্র পালন করেনি। ফলে তাকে এরকম শাস্তি দেওয়া হলো।

আমি মনে করি অরিত্রির মতো শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার কারণ শিক্ষকদের বকুনির জন্য হতে পারে না। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তোলার নিয়ম নেই। কিন্তু মুখেও যদি কিছুটা শাসন না করা যায় তাহলে শিক্ষার্থীরা ভালো মানুষ হবে কী করে? তাহলে তো শিক্ষকদের কোনো প্রয়োজন পড়ে না যে যার মতো আসলো, গেল, ইচ্ছামতো চলল ব্যাস এটাই শিক্ষা পদ্ধতি। শাসন তো অবশ্যই থাকতে হবে। আমরা অরিত্রি হত্যার আগে স্কুলে যে-সময় তার বাবা এসেছিলেন এবং শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন আমরা সে ভিডিও ফুটেজে ভয়ঙ্কর কিছু লক্ষ করিনি। যদি তারপরও এরকম আত্মহত্যা হয় তাহলে আমি বলতে পারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা করা উচিত। কেননা তারা শিক্ষক ছাড়াও সাধারণ কর্মচারী থেকে শুরু করে প্রত্যেকের কাছে কি পরিমাণ যে মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় তা বলার বাইরে।

তবে অরিত্রির মতো শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার কারণ কি? আমি জানি যাদের সন্তান হারায় সে মা-বাবা বুঝেন সন্তান হারানোর কী যাতনা! বর্তমানে অরিত্রির বয়সী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাবা-মা আজকাল সন্তানকে তেমন সময় দেন না। সে বলতে চায়, সে কী করতে চায়, তার কী প্রয়োজন এটি বুঝতে চান না। এমনকি অফিসের কারণে সপ্তাহে অন্য ছয়দিন সুযোগ না পেলেও শুক্রবার যখন সময় পান তাও ঘুমিয়ে কাটান। ফলে সন্তানের অনেক কিছু অপূর্ণ থেকে যায়। বয়ঃসন্ধিকালের দিকে খেয়াল না রাখা বাবা মায়ের। এ বয়সে তার প্রতি যত্নশীল না হলে সে যত বড় মেধাবী হোক না কেন সে অন্য কিছুর প্রতি আকর্ষিত হয়ে ভুল পথে পা বাড়াবে। বর্তমানে কেউ যদি জরিপ করেন দেখতে পাবেন বেশিরভাগ ছোট ছোট ছেলেমেয়ের চোখে চশমা ব্যবহার করতে হয় চোখে কম দেখেন বলে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে পাবেন মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং টিভি দেখা। অভিভাবকরা আর কিছু না পারলেও এটি জোগাড় করে দিতে কার্পণ্য করেন না। যেখান থেকে তৈরি হয় মানসিক সমস্যা, মানসিক হতাশা। ছোট বাচ্চার যার দরকার বাইরে খোলা আকাশে ঘুরে-ফিরে নিজেরা খেলনা হাতে তৈরি করে খেলা, কিন্তু না তারা মোবাইলাসক্ত। এ নিয়ে আবার অভিভাবক গর্বও করেন আমার বাচ্চা মোবাইলের অমুক বুঝে তমুক বুঝে যা আমিও বুঝি না। বিশ্বে বাংলাদেশের ঢাকা ফেইসবুক ব্যবহারে দ্বিতীয় হওয়ার পিছনে রয়েছে তরুণদের এক বিশাল অংশ মানে প্রায় পুরোটাই অল্প বয়সী। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার ফলে মনের কথা, দুঃখ-সুখ ভাগাভাগি করার জন্য সে রকম কোনো কাছের মানুষ না পাওয়া। বাস্তবতা বুঝার জন্য কম বেশি শারীরিক পরিশ্রম করতে না দেওয়া। বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাইরের পরিবেশ না চিনানো। সর্বোপরি বাবা-মার অতিরিক্ত ভালোবাসার ক্ষতিকর প্রভাব এবং সচেতনতার অভাবই সন্তানকে আত্মহত্যার পথে নিয়ে যেতে পারে। তাই এ ব্যাপারে আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন।

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়