ভাষা আন্দোলনের সময় প্রথম যে দশজনকে গ্রেফতার করা হয়, জহির রায়হান ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ভাষা আন্দোলনের ঝড় সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া জহিরকে পালটে দেয়। তাঁর সৃষ্টিতে বারবার ভাষা আন্দোলন এসেছে। ড. হুমায়ুন আজাদ এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘জহির রায়হান সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র কথাসাহিত্যিক যাঁর উদ্ভবের পেছনে আছে ভাষা আন্দোলন। যদি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন না ঘটত তবে জহির রায়হান হয়তো কথাশিল্পী হতেন না।’
১৯৫৬ সালে প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক এ জে কারদার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অবলম্বনে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ নির্মাণের জন্য ঢাকায় আসেন। জহির রায়হানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হলে এই ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে নেন তাঁকে। এর পর তিনি সালাউদ্দিনের ‘যে নদী মরুপথে’ এবং এহতেশামের ‘এদেশ তোমার আমার’ ছবিতে সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এহতেশামের ছবিটির শীর্ষ সংগীতও লেখেন জহির রায়হান। ১৯৬১ সালে তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ ছবির মাধ্যমে। এরপর একে একে মুক্তি পায় সোনার কাজল (১৯৬২), কাচের দেয়াল (১৯৬৩), সঙ্গম (১৯৬৪), বাহানা (১৯৬৫), বেহুলা (১৯৬৬) ও আনোয়ারা (১৯৬৭)। ১৯৭০ সালে মুক্তি পায় তাঁর সর্বশেষ ও সেরা চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’। এই ছবিতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সর্বগ্রাসী, স্বৈরাচারী মনোভাবকে তুলে ধরেন জহির রায়হান। ইঙ্গিত দেন যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। ছবিটি নির্মাণ ও মুক্তি দিতে গিয়ে তাঁকে পোহাতে হয় নানা ঝামেলা। সরকার টাল-বাহানা শুরু করলে জনতার প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায় ছবিটি।
জহির রায়হান সব সময় তাঁর ছবিতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতেন। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন এবং পরের বছরে মুক্তি পাওয়া ‘বাহানা’ ছিল সিনেমাস্কোপে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র। ১৯৬৫ সালে তিনি তাঁর উপন্যাস ‘আর কতদিন’ অবলম্বনে Let Their Be Light নামে একটি ছবি নির্মাণের ঘোষণা দেন। জহির রায়হানের ইচ্ছে ছিল, ছবিটি নির্মিত হবে ইংরেজি ভাষায় এবং ডাব করা হবে বাংলা, উর্দু, রুশ এবং ফরাসি ভাষায়। এই ছবির কাজ শুরু করেন ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে। ছবির মহরতও অনুষ্ঠিত হয় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল-এ। শুটিং শুরু হওয়ার কিছুদিন পরেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পাড়ি দেন ভারতে।
জহির রায়হান একাত্তরের যুদ্ধের প্রতিবাদ শুরু করেন ক্যামেরার মাধ্যমে। বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দেন পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার চিত্র ধারণ করে। নির্মাণ করেন Stop Genocide। এই ছবির ধারা বর্ণনা করেন চিত্রপরিচালক আলমগীর কবির। ১৯৭১ সালে কলকাতায় ‘জীবন থেকে নেয়া’র বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং ছবিটি দেখে সত্যজিত্ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ প্রশংসা করেন। নিজে সে সময় চরম অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যে থাকলেও ছবির প্রদর্শনী থেকে পাওয়া সমস্ত অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেন। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে এসে সম্পন্ন করেন তথ্যচিত্র A State Is Born-এর কাজ।
বিজয়ের প্রাক্কালে তাঁর বড়ো ভাই কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারকে তুলে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনী। দেশে ফেরার পর থেকেই ভাইয়ের সন্ধান করতে থাকেন জহির রায়হান। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি এক ফোন পেয়ে ভাইকে খুঁজতে যান মিরপুরে। তাঁর মরিস মাইনর গাড়িটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলেও জহির রায়হানের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। ১৯৯৯ সালে জুলফিকার আলী মানিকের প্রতিবেদন ‘নিখোঁজ নন, গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন জহির রায়হান’ প্রকাশিত হয়। সে বছর সাপ্তাহিক ২০০০-এ পুত্র অনল রায়হান ‘বাবার অস্থ্থির সন্ধানে’ নামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হলে সমাধান হয় জহির রায়হান অন্তর্ধান রহস্যের। জানা যায়, স্বাধীনতাযুদ্ধে পরাজিত শক্তির গুলিতে প্রাণ হারান আমাদের চলচ্চিত্রের এই প্রবাদ পুরুষ।