ফেনীতে আমন-আউশের মধ্যবর্তী সময়ে খালি পড়ে থাকা জমিতে কৃষকরা সাথী ফসল হিসেবে সরিষা চাষ করছেন। এতে কৃষকদের বাড়তি আয়ের সংস্থান হচ্ছে। তেলজাতীয় শস্য সরিষা চাষ সহজ এবং বাজারমূল্য আশানুরূপ থাকায় ফেনী জেলার কৃষকরা সরিষা চাষে ঝুঁকছেন। কৃষকরা জানান, বীজ বপনের ৭০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যে সরিষায় ফলন আসে।
ফেনী সদর উপজেলার উত্তর কাশিমপুর, সোনাগাজীর আমিরাবাদ ও ছাগলনাইয়ার শুভপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায় হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে পুরো মাঠ। স্থানীয় কৃষক হামিদ আলী, মনসুর মিয়াসহ বেশ কয়েক জন বলেন, সরকারি সহযোগিতায় বীজ ও চাষের পরামর্শ পাওয়ায় বেড়েছে সরিষার আবাদ। বছরের যে সময়টায় মাঠ খালি পড়ে থাকে, সে সময়টা সরিষা আবাদ করে লাভবানও হচ্ছেন তারা।
ফেনী সদর উপজেলার উত্তর কাশিমপুর এলাকার বাসিন্দা সৌরভ পাটোয়ারী জানান, তিনি নিজের পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য এক একর আট শতাংশ জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন। গেল বছরও ৬৬ শতাংশ জমিতে সরিষা লাগিয়েছিলেন। তাতে ফলনও হয়েছে তার বেশ। তাই লাভের আশায় এবারও তিনি আবাদ বাড়িয়েছেন। ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের জগন্নাথ সোনাপুর গ্রামের চাষি কবির আহম্মদ জানান, এ বছর ৯০ শতাংশ জমিতে তিনি সরিষা চাষ করেছেন। এবার ৩৬০ থেকে ৩৭০ কেজি সরিষা পাবেন বলে তিনি আশাবাদী।
ফেনী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪ হাজার ২০০ একর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে সদর উপজেলায়। এখানে আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৩০০ একর জমিতে এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ফাজিলপুরে ২৩৪ একর। সরকারিভাবে জেলায় ১৫০ জন কৃষককে প্রদর্শনীর জন্য বিনামূল্যে নগদ অর্থ এবং ২ হাজার কৃষককে বিঘাপ্রতি প্রণোদনা হিসেবে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফেনীর তথ্যমতে, গত মৌসুমে জেলার ছয় উপজেলায় ৩ হাজার ৫২০ একর জমিতে বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, ৯ ও ১৭ চাষ করে ১ হাজার ৮৬৪ মেট্রিক টনের বেশি উত্পাদন হয়েছিল। এ বছর ৪ হাজার ২০০ একর জমিতে বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫ ও বারি সরিষা-১৭ চাষ করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, প্রতি একরে সরিষা উত্পন্ন হবে জাতভেদে ৪০০ থেকে ৪৫০ কেজি। বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা। সরিষা ভাঙলে প্রতি একরে তেল আসে ৪০ থেকে ৪৫ কেজি। প্রতি কেজি সরিষার তেল বাজারে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিঠুন ভৌমিক জানান, বারি সরিষা-১৪ চাষ করতে প্রতি একরে চাষ, বীজ, সার, ওষুধ ও সেচে কৃষকের সর্বোচ্চ ব্যয় হয় ১০ হাজার টাকা। আর উত্পাদন হয় ৬০০ কেজি, যার বাজারমূল্য ৪৮-৫০ হাজার টাকা। আমন ও আউশের মধ্যবর্তী সময়ে কম খরচে বাড়তি আয়ের জন্য কৃষকদের মধ্যে সরিষা চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমীন আক্তার জানান, সরিষা চাষে কৃষকদের উত্সাহিত করার জন্য বারি সরিষা-১৪, ১৫ ও ১৭ জাতের ৪০টি প্রদর্শনী ও ৬০০ কৃষককে প্রণোদনা হিসেবে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে।
ফেনী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন খান বলেন, গত বছর নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ও চলতি মাসে ৫ জানুয়ারি প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় কৃষকের জমি তৈরিতে বিঘ্ন হয় এবং ফসল বিনষ্ট হয়। তাই এবার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। তিনি আরো জানান, সরিষা চাষ জনপ্রিয় করতে কৃষিবিভাগ থেকে কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। কৃষক খালি পড়ে থাকা অনাবাদি জমিতে সরিষা চাষ করলে লাভবান হবেন।