তাত্ত্বিকগণ মনে করেন, হাওরাঞ্চল পূর্বে সাগরের বিশাল জলরাশি ছিল। সাগর আস্তে আস্তে দক্ষিণে সরে গিয়েছে এবং কালের বিবর্তনে তা হাওরের রূপ লাভ করেছে। ভাষাবিদগণ ‘হাওর’কে ‘সাগর’ শব্দের অপভ্রংশ বলে অভিমত প্রদান করেছেন। ‘সাগর’ শব্দ লোকমুখে বির্বতিত হয়ে ‘হাওর’ (সাগর>সাওর>হাওর) হয়েছে। বাংলাদেশ যেমন পৃথিবীর সর্বোচ্চ নদীবিধৌত সমতল ভূমির দেশ, তেমনি এদেশে রয়েছে প্লাইস্টোসিনকালের বিভিন্ন গড় অঞ্চল, পাহাড় ও সুবিশাল সমুদ্র উপকূল। বাংলাদেশের ভূ-বৈচিত্র্যের এক অনন্য স্বতন্ত্র দিক হচ্ছে হাওর। বাংলাদেশের বিশাল অংশ হাওর এলাকা হিসেবে পরিচিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া—অর্থাত্ এই সাত জেলার প্রায় ৮ দশমিক ৫৮ লাখ হেক্টর জমি নিয়ে হাওর অঞ্চল গঠিত, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে ছোটো-বড়ো ৪১৪টি হাওর, জলাশয় ও জলাভূমি রয়েছে। জলমহাল রয়েছে ২৮ হাজার। বিল রয়েছে ৬ হাজার ৩০০। বাংলাদেশে আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে হাওরের রয়েছে বিশাল প্রভাব। হাওরপাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবন হাওর দ্বারা প্রভাবিত। এই অঞ্চলের মানুষের চিন্তা-চেতনা, মেধা-মনন, সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য—সবকিছু হাওরকেন্দ্রিক। তাই এসব ক্ষেত্রে হাওর এলাকার সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার রয়েছে বৈসাদৃশ্য। হাওরে বসবাসরত মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেই বেঁচে আছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ঝড়, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত, আগাম বন্যা (Flash flood) হাওরের বেশির ভাগ ঘরবাড়ি ভেঙে লন্ডভন্ড করে দেয়। এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ হাওর অঞ্চলে পানির উচ্চতা প্রাক্বর্ষা মৌসুমে দশমিক ৩ থেকে দশমিক ৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সুতরাং সময় থাকতেই হাওরে আনতে হবে পরিকল্পিত কর্মসূচি, যে কর্মসূচি হবে উন্নত পৃথিবীর পানিবেষ্টিত জনপদের মতো জীবনবান্ধব। এ এলাকার জীবনব্যবস্থায় যার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি কেবলই পানি আর পানি, তখন পানিসহায়ক কর্মকাণ্ড যেমন—ধান চাষ, মত্স্য চাষ, হাঁস চাষ, পানি ফলের চাষ, নৌকাযোগাযোগ ইত্যাদি এই অঞ্চলের মূল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সময়ের পরিক্রমায় জীবিকার ধরনেও পরিবর্তন হয়। হাওর এলাকার এসব দিক চিন্তা করে হাওরকেন্দ্রিক উন্নয়ন ভাবনা প্রথম শুরু হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাধ্যমে। হাওর ও জলাভূমি এলাকার জনগণের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠনের নির্দেশ প্রদান করেন। পরবর্তীকালে ১৯৭৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয় কিন্তু হাওর এলাকার সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের যে স্বপ্ন নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বোর্ডটি বিলুপ্ত করা হয়। হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ে। হাওর এলাকার মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে পিছিয়ে পড়ে। জাতির পিতার পর হাওর এলাকার উন্নয়নের সুবাতাস আবার আসতে থাকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে। ১৯৯৮ সালের ৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইনে এক জনসভায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাওর ও জলাভূমি এলাকার উন্নয়নে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালের ১০ জানুয়ারি দুটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’ এবং বোর্ডের ‘কার্যনির্বাহী কমিটি’ গঠন করা হয়। পরে হাওর ও জলাভূমি এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডকে অধিদপ্তর ঘোষণার নির্দেশ প্রদান করেন। হাওর এলাকার মানুষের সার্বিক উন্নয়নের কথা বিবেচনায় নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় হাওর এলাকার জনজীবন, জীবিকা, পরিবেশ-প্রতিবেশসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য ২০১২ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত মোট ২০ বছর মেয়াদি একটি হাওর মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
অসীম সম্ভাবনা বুকে ধারণ করে জেগে আছে হাওর। সম্ভাব্য সবকিছু থাকা সত্ত্বেও যুগ যুগ ধরে হাওরাঞ্চল গুরুত্বহীন অব্যবস্থাপনার অনগ্রসরমাণ অবস্থায় পতিত। দেশকে দুই হাত ভরে দিয়ে দারিদ্র্যই তাদের সর্বশেষ পুঁজি। দুর্গম এলাকার এই সংগ্রামী মানুষ দুর্যোগ-দুর্বিপাকে দুর্বিষহ জীবন পার করে থাকে। বর্তমান সরকার হাওরের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। রাষ্ট্র যদি হাওরের অপর সম্ভাবনা ও সুযোগ কাজে লাগায়, তাহলে একদিকে যেমন হাওরবাসী উপকৃত হবে, তেমনি দেশ অর্থনীতিতে আরো সমৃদ্ধিশালী অগ্রসরমাণ হবে। হাওরই হতে পারে আরেক অর্থনৈতিক অঞ্চলের উপযুক্ত পরিবেশ। শুকনো ও বর্ষায় হাওরাঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বহুমুখী ও পরিকল্পিত উপায়ে উদ্যোগ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিলে খুলে যাবে অপার সম্ভাবনাময় দুয়ার। এটা শুধু কথার কথাই নয়, হাওর তার রূপ-গুণ ও কর্ম বিস্তীর্ণতায় তা দেখিয়ে যাচ্ছে। এই হাওরাঞ্চলের উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করা হলে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে ১০ বছরের বেশি সময় লাগবে না। হাওরের ঢেউরের মতো ফুলে-ফেঁপে উঠবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্রোত। হাওরাঞ্চল উন্নয়নে সরকারের জন্য বিবেচ্য বিষয় হতে পারে :
১. হাওরবাসীর ফসল রক্ষার জন্য নদী-নালা, খাল-বিল, হাজা-মজা পুকুর-ডোবা কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় খনন করতে হবে। ২. নদীর দুই পাড়ে, হাওরের পতিত উঁচু জমিতে, গ্রামের চারপাশে ব্যাপক হারে পানিসহিষ্ণু বৃক্ষ রোপণের জঙ্গল তৈরি করে জ্বালানি কাঠের চাহিদা মেটানো যেতে পারে। জঙ্গলে বর্ষায় মাছের উত্তম জায়গা হবে। প্রচুর খাবার মিলবে। পাখিদের অভয়াশ্রম তৈরি হবে। ৩. ঢেউয়ের আঘাতে অরক্ষিত ভিটেবাড়ি রক্ষার ববস্থা নিতে হবে। ৪. শুধু ধান চাষে নির্ভরশীল না করে হাওরবাসী কৃষকদের বহুমুখী চাষাবাদে আগ্রহী করতে হবে। কৃষকদের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. পাহাড়ি বোর্ডের ন্যায় হাওর উন্নয়ন বোর্ডকে প্রশাসনিক, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। ৬. হাওর মত্স্য ও কৃষি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা যেতে পারে। ৭. হাওরাঞ্চলের অবস্থা, প্রকৃতির ধরন, অবকাঠামোর বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার স্থায়ী অবকাঠামোগত ব্যবস্থা এবং ভাসমান বা ভ্রাম্যমাণ চিকিত্সাকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থসেবা নিশ্চিত করতে হবে। ৮. হাওরাঞ্চলে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাওরের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক ফ্যাকাল্টি রাখা যেতে পারে। ৯. ঋণ ও প্রশিক্ষণের সুবিধা দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প চালু করতে হবে। ১০. হাওরাঞ্চলের প্রকৃত পরিবেশকে উপজীব্য করে সেখানে পর্যটনের ব্যবস্থা করতে হবে। ১১. উন্নত পাথর, বালু ও সিমেন্টের সহজলভ্যতা থাকায় বৈদ্যুতিক পোল এবং সিরামিক কারখানা গড়ে তোলা যেতে পারে। ১২. দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হাওরাঞ্চলের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা ও পাঠ পরিক্রমা চালু করতে হবে। ১৩. হাওর এলাকার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জীবন-সংগ্রাম প্রভৃতি সংরক্ষণে সেখানে একটি ‘হাওর মিউজিয়াম’ করা অত্যাবশ্যক। ১৪. হাওরে সৌর বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ১৫. নারীদের কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে হবে। ১৬. মত্স্য গবেষণা কেন্দ্র, একাধিক মত্স্য অবতরণ কেন্দ্র এবং বর্ষায় হাওরের পানিতে নিদির্ষ্ট স্থানে ঘের করে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা ব্যাপকভাবে অবমুক্ত করতে হবে। এই পোনা বড়ো হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার পর মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা যেতে পারে। মুক্ত জলাশয়ে ঘের পদ্ধতিতে মাছের চাষ এবং ভাসমান সবজি চাষের কথা ভাবা যেতে পারে। ১৭. শুকনো মৌসুমে দেখা যায় মাঠের পর মাঠ। ঘাস আর ঘাস। এই ঘাস আর মাঠকে কেন্দ্র করে দুগ্ধখামার, গরু মোটাতাজাকরণ ও ছাগল পালন প্রকল্প করা যেতে পরে। ১৮. শুকনো সময়ে পতিত চট্টন এলাকাকে কী করে উত্পাদনশীল হিসেবে তৈরি করা যায়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। ১৯. হাওরাঞ্চলের প্রকৃতি-পরিবেশকে উপজীব্য করে সেখানে পর্যটনের ব্যবস্থা করতে হবে। ২০. ছাতক-সুনামগঞ্জ-মোহনগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ করা প্রয়োজন।
তবে আশার কথা, বর্তমান সরকার হাওরাঞ্চল, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলায় মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, টিটিসি, বিটাক, নার্সিং ইনস্টিটিউট, সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নতীকরণ, ৭৫০ মিটার দীর্ঘ যাদুকাটা ব্রিজ, সর্বশেষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বিশ্ববিদ্যালয়ে হাওরের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক ফ্যাকাল্টি রাখা যেতে পারে) এবং দিরাই-শাল্লা-আজমিরীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক একনেকে অনুমোদনের মাধ্যমে হাওরবাসী নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
n লেখক :উপপরিচালক, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সুনামগঞ্জ