আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগকে আরো শক্তিশালী করতে চাই। এজন্য আমাদের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আরো শক্তিশালী হবে।’ গতকাল বুধবার ইত্তেফাককে দেওয়া একান্ত সাক্ষাত্কারে তিনি এ কথা বলেন। দ্বিতীয়বারের মতো উপমহাদেশের প্রাচীনতম দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো মিডিয়াকে দেওয়া এটাই তার প্রথম সাক্ষাত্কার।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগ হবে অধিকতর স্মার্ট ও প্রযুক্তিমনস্ক। আমরা প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যের সম্মিলন ঘটাতে চাই। সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে উদারনৈতিক রাজনৈতিক ধারা তৈরি করতে চাই। কোন্দল ও কলহমুক্ত স্বচ্ছ ভাবমূর্তির দল গড়ে তুলতে চাই। তৃণমূল পর্যন্ত দলকে সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এবার আমাদের দলগত অবস্থান দুর্নীতির বিরুদ্ধে। সুশাসন প্রতিষ্ঠাও আমাদের অগ্রাধিকার। এছাড়া সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দল গতভাবেও আমাদের তৈরি হতে হবে। দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় আমি দলের প্রধান দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক সম্মান ও কৃতজ্ঞতা।’
আপনার দৃষ্টিতে আমাদের দেশে রাজনীতির বড়ো সমস্যা কী—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমি মনে করি প্রতিহিংসা, পরনিন্দা ও পরচর্চাই সমস্যা।’
সরকার ও দল আলাদা হওয়া প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সম্প্রতি আপনারা লক্ষ করেছেন, সরকার থেকে দলকে বিযুক্ত করা হচ্ছে। লক্ষ করে থাকবেন, কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা যারা আগে সরকার ও দলের দায়িত্ব পালন করেছেন, এবার তারা সরকারে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে দল সহযোগিতা দিতে পারে। সেজন্য দল সুসংগঠিত হলে একদিকে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা সহজতর হয়, জনমানুষের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়।’
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ পথচলার পেছনে শক্তির উত্স কী—এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগ মাটি ও মানুষের সংগঠন। এই দলের প্রধান শক্তি মানুষের ভালোবাসা। তৃণমূলের শক্তিই এই সংগঠনকে টিকিয়ে রেখেছে। মানুষের জন্য কাজ করে বলে মানুষের ভালোবাসা এই দলকে টিকিয়ে রেখেছে। বর্তমান ছাত্ররাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতি সময়ের বহমানতাকে ধারণ করে। সময়ের প্রয়োজনেই গর্জে ওঠে ছাত্রসমাজ। এদেশের ছাত্রসমাজ দেশের বৃহত্ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা অনুযায়ী আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত হয়েছে। আবার ’৭৫-এর কালো অধ্যায় তথা জাতির পিতাসহ তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যেমন বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁক বদল হয়েছে, তেমনি ছাত্ররাজনীতির প্রেক্ষাপটও বদলে গেছে।
আওয়ামী লীগ মানেই শেখ হাসিনা, বিষয়টি কীভাবে দেখেন? এ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘শেখ হাসিনা ইজ লার্জার দ্যান আওয়ামী লীগ। তার উচ্চতা আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশি। ’৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শেখ হাসিনা। তিনি নবমবারের মতো বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এ সৌভাগ্য তিনি ছাড়া আর কেউ অর্জন করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতার রোল মডেল আর শেখ হাসিনা আমাদের উন্নয়নের রোল মডেল।’
বিরোধীদলীয় রাজনীতি প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। আমার মতে, বিএনপি ভুল রাজনীতির চোরাবালিতে আটকে গেছে। তারা আন্দোলনেও ব্যর্থ, নির্বাচনেও ব্যর্থ। তারা এখন পথহারা পথিকের মতো দিক্ভ্রান্ত। নেতিবাচক রাজনীতির কারণে জনগণ থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এছাড়া দলটিতে আছে নেতৃত্বের সংকট। যে দলের প্রধান দুর্নীতির কারণে সাজাপ্রাপ্ত, সেই দলের কর্মীরা স্বভাবতই হতাশাগ্রস্ত। আরেকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যিনি পলাতক আসামি। নেতাদের মাঝেও পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার সংকট রয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনীতির দেউলিয়াত্ব উন্মোচিত হয়েছে।’
আওয়ামী লীগ এবার সাড়ম্বরে মুজিববর্ষ উদ্যাপন করছে। এ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার জন্মশতবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবন এবং কর্ম আমরা দেশের পাশাপাশি বিদেশে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছি। এর মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে আমরাও মর্যাদাবান হতে পারি। দুইভাবে মুজিববর্ষের কর্মসূচি পালন করা হবে। জাতীয় পর্যায়ে গঠিত কমিটির পাশাপাশি আমরা দলীয়ভাবেও কর্মসূচি পালন করব।
‘সন্ত্রাসীরা ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত করতে পারে’
এদিকে গতকাল সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সমসাময়িক ইস্যুতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সিটি করপোরেশন ভোটের দিন কেন্দ্রে পাহারার নামে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পরিবেশ বিঘ্নিত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভোটের পরিবেশ এখন পর্যন্ত ভালো আছে। একটা বিষয় খুব উদ্বেগজনক সেটা হচ্ছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে বহিরাগতদের জড়ো করা এবং অস্ত্রধারীরাও এর মধ্যে আছেন। নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি জরুরিভিত্তিতে দেখতে হবে। কারণ এমন অভিযোগ আছে, খবর আছে—পাহারার নামে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা দিতে পারে। সেই অবস্থায় নির্বাচন কমিশনকে বাড়তি সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।’
বহিরাগতদের উপস্থিতি কোন্ দলের বেশি? এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘বিএনপি সারা বাংলাদেশ থেকে বহিরাগতদের এনে ঢাকায় জড়ো করছে। এদের মধ্যে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, দাগি সন্ত্রাসীরাও রয়েছে।’
নির্বাচন কমিশনের কাছে কী অনুরোধ থাকবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন অশুভ কোনো তত্পরতা বন্ধ করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন নজরদারিতে রাখবে। বহিরাগতদের নজরদারিতে রাখা, অস্ত্রধারী, সন্ত্রাসী ও চিহ্নিত অপরাধীদের ব্যাপারে কমিশন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে কাজে লাগাবে—এটাই অনুরোধ।’
গত জাতীয় নির্বাচন থেকে এই সিটি নির্বাচন ভালো হবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমরা একটা উত্সবমুখর ও ভালো নির্বাচন আশা করি। সরকারি দল হিসেবে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত।’
পদ্মা সেতুতে প্রায় ১ হাজার চীনা শ্রমিক-কর্মী কাজ করেন উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে কোনো অসুবিধার সৃষ্টি হবে না। আমরা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি। ইতিমধ্যে যারা চীন থেকে এসেছেন, নিয়ম অনুযায়ী তাদের ১৪ দিন সব কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখা হয়েছে।