করোনো ভাইরাস

পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাণিজ্যে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা

চীনের করোনা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ এখন বিশ্বব্যাপী। চীনের মধ্যেই বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত সীমিত হয়ে গেছে। আর দেশটিতে বাদবাকি বিশ্বের মানুষের যাতায়াত কমে গেছে। এসব কারণে চীনের বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কেট ওয়াচ এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ব অর্থনীতির শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ (০.৭%) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যার আর্থিক মূল্য ৫৭০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এরই মধ্যে চীনের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চীনা শেয়ারবাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ১৩টি বড়ো শহরে চলাচল সীমিত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাড়ে ৩ কোটি মানুষ। দীর্ঘ মেয়াদে এ ভাইরাসের প্রভাব থাকলে কিংবা তা ছড়িয়ে পড়লে চীনসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে তা বড়ো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ভাইরাস নিয়ে আশু কোনো সুরক্ষা তৈরি না হলে কিংবা তা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—তার হিসাব করছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও। বাংলাদেশে প্রায় ঘরে ঘরেই বলতে গেলে চীনা পণ্য। চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য বাংলাদেশ চীন থেকে আমদানি করে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড়ো বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এরই মধ্যে চীনে পর্যটকদের যাতায়াত কমে যাওয়ায় প্রাথমিকভাবে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এছাড়া বাংলাদেশের বেশ কিছু বড়ো প্রকল্পে চীনা নাগরিকরা কাজ করছেন। তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ এখন দেশটির চলমান নববর্ষে এক মাসের ছুটিতে চীনে অবস্থান করছেন। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি তা শেষ হবে। তাদের আসার ক্ষেত্রে দেরি হলে তা উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, পর্যটনে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দীর্ঘ মেয়াদে এ সমস্যা থাকলে নতুন করে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। চীন থেকে বিভিন্ন ধরনের তৈরি পণ্য বাংলাদেশে আসে। এক্ষেত্রে সরকার কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলে বাণিজ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। আবার বাংলাদেশ চীন থেকে বিশাল পরিমাণ ফ্যাব্রিক আমদানি করে। বিদেশি ক্রেতারা চীনের বস্ত্র দিয়ে পোশাক তৈরি না করার শর্ত আরোপ করলে বিকল্প খুঁজতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি প্রাপ্তিও হয়তো সহজ হবে না। এতে কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে অন্য দেশগুলো বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, সে অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজে লাগাতে পারে বলে মনে করেন তিনি। বিশেষত কিছু কাঁচামালের ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টাইন (উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ) ইস্যুটিতে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে এসব কারণে চীনা কোম্পানির মাধ্যমে চলমান দেশের প্রকল্পগুলোর কার্যক্রমও কিছুটা শ্লথ হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চীনা কর্মকর্তাদের আনার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করে জনস্বার্থ বিবেচনায় বরং কিছুটা নিরুত্সাহিত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি আমদানি রপ্তানিসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

অবশ্য এ বিষয়ে এখনই উদ্বিগ্ন না হলেও সতর্ক হওয়া উচিত বলে মনে করেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, পরিস্থিতি বুঝতে হলে আমাদের আরো আগামী ১০ দিন অপেক্ষা করতে হবে। কারণ  কোয়ারেন্টাইন বিষয়ে চীন পদক্ষেপ নিচ্ছে।

অবশ্য এর মধ্যেও সম্ভাবনা দেখছেন গার্মেন্টস উদ্যোক্তা ও বিকেএমইএর পরিচালক ফজলে শামীম এহসান। তিনি বলেন, চীনে এ ভাইরাসের প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে থাকলে সেক্ষেত্রে চীন থেকে ক্রয়াদেশ সরতে পারে এবং তাতে বাংলাদেশ হয়তো লাভবান হতে পারে। অবশ্য এ ভাইরাস দীর্ঘ মেয়াদে থাকুক, তা চাই না।

দেশটির লক্ষাধিক মানুষ সরকারি প্রকল্পসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে বাংলাদেশে থাকেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চীনা নাগরিক এখন ছুটি কাটাতে সেখানে রয়েছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ ভাইরাসের কারণে তাদের এখানে ফিরতে দেরি হলে ব্যবসায়ে প্রভাব পড়বে। আবার কেউ ভাইরাস নিয়ে আসলে তা অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। ফলে এ বিষয়টিও বিশেষভাবে দেখা দরকার বলে মনে করেন তারা।