করোনা ভাইরাস

বিশ্ব জুড়ে আসতে পারে জরুরি অবস্থা

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭০ জন। আক্রান্ত হয়েছেন চীনের ৭৭১১ ব্যক্তি। চীনের প্রতিটি অঞ্চলে এখন ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস। এছাড়া ২২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা মহামারির আশঙ্কা করছেন। বিশ্ব জুড়ে আসতে পারে জরুরি অবস্থা।  বিশ্ববাসীকে সতর্ক থাকতে বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এদিকে গুয়াংজু থেকে ১০০ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে দেশে এসেছেন বাংলাদেশি এক ছাত্র। তাকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে রেখে পরীক্ষানিরীক্ষা করা হচ্ছে। চীন থেকে দেশে ফিরতে আগ্রহী ৩৭০ বাংলাদেশি। ভারতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণের অংশ হিসেবে অভূতপূর্ব দ্রুততায় তৈরি হচ্ছে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক।

ভয়াবহ ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। এই রোগের কোনো আরোগ্য নেই, নেই কোনো প্রতিষেধক। এর আগে অনেকবার এরকম পরিস্থিতিতে পড়েছে বিশ্ব। শুধু গত পাঁচ বছরেই বিশ্বে ইবোলা, জিকা, মার্স (মিডল ইসট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম) নামের আরেক ধরনের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শঙ্কায় ফেলেছে সারা বিশ্বকে। আগের রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাগুলোর সঙ্গে যদি তুলনা করা হয়, তাহলে দেখা যায় যে সেসব ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল। তবে এবার ভাইরাসটি চিহ্নিত করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই ভাইরাস ছড়ানো বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের গবেষণা শুরু হয়। চীনের কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুত এই ভাইরাসের জেনেটিক কোড জানিয়ে দেয়। এর ফলে বিজ্ঞানীরা সহজে একটি ধারণা তৈরি করতে পারেন যে এই ভাইরাসটি কোথা থেকে এসেছে, ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটির প্রকোপ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং এই ভাইরাস থেকে মানুষকে কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এদিকে বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা জারি করা উচিত কি না তা নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির মহাপরিচালক টেড্রোস অ্যাডানম গ্যাব্রিয়েসুস বুধবার জার্মানি, ভিয়েতনাম এবং জাপানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘গত কয়েক দিনে মানুষে-মানুষে সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস যেভাবে কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে তা উদ্বেগের ব্যাপার। যদিও চীনের বাইরে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এখনো খুবই কম, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি প্রোগ্রাম বিভাগের আনা মারিয়া হেনাও-রেস্টরেপো বলেন, ‘আমরা একটা কাঠামো তৈরি করেছি, যার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কাদের তৈরি করা প্রতিষেধক সবার আগে ব্যবহার করা হবে। বিশেষজ্ঞরা তৈরি করা প্রতিষেধকগুলোর গ্রহণযোগ্য নিরাপত্তা মাত্রা, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার যথাযথ প্রতিক্রিয়া ও প্রতিষেধকের পর্যাপ্ত যোগানের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন। মানুষের ওপর কোন প্রতিষেধক পরীক্ষা করা হবে তা কিছু দিনের মধ্যে নিশ্চিত করবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।’

চীনের উহান থেকে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী ভারতে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা। বৃহস্পতিবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ কেরালায় নভেল করোনা ভাইরাসের পরীক্ষায় এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায় এক শিক্ষার্থীর শরীরে। দেশটির সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রথমবারের মতো দক্ষিণাঞ্চলীয় কেরালায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী পাওয়া গেছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে আক্রান্ত ঐ রোগী চীনের উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল এবং তাকে কেরালার একটি হাসপাতালে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। ভারতের জ্যেষ্ঠ সরকারি এক কর্মকর্তা বলেন, আক্রান্তের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় করোনা ভাইরাসের প্রাণকেন্দ্র উহান থেকে ভারতীয়দের ফিরিয়ে আনার চেয়ে অন্য কোনো উত্তম বিকল্প নেই। নাগরিকদের ক্রমাগত চাপের কারণে উহান থেকে ভারতীয়দের ফেরত আনতে একটি বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উহানে ভারতীয় অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন; যারা সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। চলতি সপ্তাহেই উহান থেকে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ভারত সরকার একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমান প্রস্তুত রেখেছে। কিন্তু চীন সরকারের অনুমতি না পাওয়ায় নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত এখনই বাস্তবায়ন করতে পারছে না ভারত।

এদিকে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া নিজ নাগরিকদের চীন থেকে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করায় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নাগরিকদের ফেরানোর দাবি জোরালো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে উহান থেকে ১৯৫ মার্কিন নাগরিককে ফিরিয়ে নিয়েছে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার ২১০ জন জাপানিকে টোকিওর একটি চার্টার্ড বিমানে করে চীন থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এর আগে বুধবার আরো ২০৬ জনকে জাপানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পরে পরীক্ষানিরীক্ষায় এই জাপানিদের মধ্যে তিন জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, এখন পর্যন্ত একজন বাংলাদেশি ছাত্রসহ তিন জন রোগী জ্বর ও ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের মধ্যে রাজধানীতে দুজন ও খুলনা হাসপাতালে ১ জন ভর্তি হন। ইতিমধ্যে তিন জন রোগীর দুজন বাড়ি ফিরে গেছেন। তাদের নমুনা পরীক্ষায় করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি মেলেনি। স্বাস্থ্য মহাপরিচালক জানান, চীন থেকে আসা ঐ বাংলাদেশি ছাত্রের জ্বর ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো ও সুস্থ রয়েছেন। নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া গেলে তাকেও রিলিজ দেওয়া হবে।

করোনা ভাইরাস পরীক্ষার নামে বিভ্রান্তি না

ছড়ানোর আহ্বান স্বাস্থ্য ডিজির

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কামাল আজাদ ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করার রি-এজেন্ট আইইডিসিআরের কাছে রয়েছে। এই পরীক্ষায় পজিটিভ ধরা পড়লেই যুদ্ধ ঘোষণার মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে। এখনো পর্যন্ত কোনো পজিটিভ ধরা পড়েনি। করোনা ভাইরাস ধরা পড়া নিয়ে ভারতের কাছে যে ব্যবস্থা রয়েছে, সেই ব্যবস্থা আমাদের কাছেও রয়েছে। এরপরও যদি সেকেন্ড ওপিনিয়নের প্রয়োজন হয়, তাহলে পরীক্ষানিরীক্ষা করার স্যাম্পল সিডিসি আটলান্টা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভারতও একই কাজ করে।