ঢাকা সিটি করপোরেশন ১৫৬ বছরের বিবর্তন

৪০০ বছর আগের ‘বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির’ আটপৌরে ঢাকা এখন মেগাসিটি। পরিণত হয়েছে বিশ্বের সপ্তম জনবহুল মহানগরীতে। ১৬০৮ সালে মোঘল সুবেদার ইসলাম খাঁর হাত ধরে সুবা বাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকার যাত্রা শুরুর পর সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় ঢাকাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সোনারগাঁও, বিক্রমপুরসহ বাংলা অঞ্চলের অনেক নগরীরই পতন হয়েছে, কিন্তু সগৌরবে টিকে আছে ঢাকা। কখনো সুবা বাংলার রাজধানী, কখনো প্রাদেশিক রাজধানী, কিংবা বিভাগীয় কেন্দ্র। সবশেষে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী।

ইতিহাসের দীর্ঘযাত্রায় ঢাকার প্রশাসন ও সেবা ব্যবস্থায় যুগে যুগে এসেছে নানা পরিবর্তন-বিবর্তন। আধুনিক ঢাকার সেবা সংস্থা পৌরসভা থেকে পৌর করপোরেশন, এরপর সিটি করপোরেশন। শহরের আয়তন, জনসংখ্যা ও সেবা সংস্থার কর্মপরিধি বৃদ্ধি পায় বহুগুণ। ডিস্ট্রিক্ট মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্টের মাধ্যমে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কমিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৪ সালে। সেই গোড়াপত্তনকালে ঢাকার দৃশ্যপট এমন ছিল যে, ‘সন্ধ্যাগুলো ধপ করে নামত তাড়াতাড়ি/পথে মিউনিসিপ্যালটির লণ্ঠনের আলো আঁধারি..।’ অতঃপর বাড়তে থাকে ঢাকার আয়তন-পরিধি আর জনসংখ্যা। ১৯৯০ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যালের আধুনিকায়ন করে রূপান্তরিত হয় ‘ঢাকা সিটি করপোরেশন’। ২১ বছর পর ২০১১ সালে সেই ডিসিসিকে রাজনৈতিক কারণে ভেঙে দুই ভাগ করা হয়। একটির নামকরণ হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), অপরটির নাম ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ঢাকার প্রধান সেবা এই সংস্থা পার করেছে নানা চড়াই-উতরাই। নগর প্রধানের আসনে কখনো নির্বাচিত; কখনো মনোনীত প্রতিনিধিরা বসেছেন। তবে নির্বাচিত প্রতিনিধির চেয়ে অনির্বাচিত প্রতিনিধিরাই বেশি সময় নগর প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। অবিভক্ত ও বিভক্ত ঢাকায় এ পদে বসা ৬৩ জনের মধ্যে মাত্র চার জন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত। বাকি ৫৯ জনের মধ্যে ২৫ জন প্রশাসক এবং অন্যরা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত বা মনোনীত মেয়র-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ঢাকা পৌরসভা

সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা যায়, ১৮৬৪ সালের ১ আগস্ট ঢাকা পৌরসভা (মিউনিসিপ্যালিটি) প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা পৌরসভায় ১৭ জন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে প্রথম তিন জন বাদে বাকি ১৪ জন ছিলেন কমিশনারদের ভোটে নির্বাচিত। পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তখনকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্কিনার। ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদাধিকার বলে এ পদে নিয়োগ পেতেন। প্রথম তিন চেয়ারম্যান, স্কিনার, ড. লাইএ্যল ও জে ব্রাডব্যারিকে নিয়োগ দেন ব্রিটিশ বাংলার গভর্নর। একটি কমিটির মাধ্যমে তারা ঢাকার সেবা ও প্রশাসন ব্যবস্থা তদারক করতেন। ১৮৮৪ সালে ওয়ার্ড কমিশনারদের দ্বারা মেয়র নির্বাচনের প্রথম সভা বসে। সে সভাই পৌরসভার চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করে। ব্রিটিশ প্রশাসন কমিশনার মনোনয়ন দিত। এতে পঞ্চায়েত কমিটিরও প্রভাব ছিল। ১৮৮৫ সালে ঢাকা পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায়। তিনি কমিশনারদের ভোটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নয়। ১৮৮৫ থেকে ১৮৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত মুসলমান চেয়ারম্যান খাজা মোহাম্মদ আসগর। তিনি ১৮৯১ থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটিশ শাসনে পৌরসভার শেষ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিমলা নন্দ দাসগুপ্ত (১৯৪০-৪৭)। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে মনোনীত বা অনির্বাচিতরাই বসেন। পাকিস্তান আমলে পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন পানাউল্লাহ আহমেদ। ১৯৪৯ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান আমলে নগর প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন ১১ জন চেয়ারম্যান, দুই জন প্রশাসক ও একজন অফিসার ইনচার্জ। এইচ এইচ ওসমানী ১৯৫৯-৬০ এবং মেজর (অব.) এ এস খানসুর ১৯৬৯-৭১ মেয়াদে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পৌর করপোরেশন ও সর্বশেষ সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয় ঢাকা পৌরসভা। অবিভক্ত ঢাকা সিটিতে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন চার জন। আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফ ১৯৯৪ সাল এবং বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা ২০০২ সালে সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন।

তথ্যানুন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ আমলে পৌর সংস্থাগুলোর প্রাচীন রীতি অনুসারে পরিচালনার আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রপতির ৭ নম্বর আদেশ অনুসারে এগুলোর প্রতিটিতে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির ২২ নম্বর আদেশ অনুসারে পৌরসভাগুলোতে সামান্য পরিবর্তন আনা হলেও এগুলোর কার্যাবলি প্রায় আগের মতোই থাকে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত চার জন প্রশাসক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকা পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত।

ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন

ঢাকার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব, বিশেষ করে মিউনিসিপ্যাল সরকারে জনপ্রতিনিধিত্ব ও করারোপের ব্যাপারে পৌরসভার প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। বিভিন্ন মহল থেকে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিকে উন্নত করার দাবি উত্থাপিত হতে থাকে। এ ধারায় ১৯৭৮ সালের অক্টোবরে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিকে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যানই নতুন করপোরেশনের মনোনীত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আবুল হাসনাত ৯ অক্টোবর ১৯৭৮ থেকে ৯ মে ১৯৮২ পর্যন্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে ‘ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন অর্ডিন্যান্স’ নামে একটি স্বতন্ত্র অর্ডিন্যান্স জারি করে সরকার। অর্ডিন্যান্সে বলা হয়, করপোরেশনটি হবে স্থায়ী উত্তরাধিকার সমন্বিত এবং সাধারণ সিলমোহরবিশিষ্ট একটি একীভূত সংস্থা এবং অর্ডিন্যান্সে উল্লিখিত ব্যবস্থাদি ও আইনের আওতায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ, দখলে রাখা এবং হস্তান্তর করা এর এক্তিয়ারে থাকবে। করপোরেশনটি ৭৫ জন নির্বাচিত কমিশনার, ১০ জন মনোনীত মহিলা কমিশনার এবং পাঁচ জন সরকারি কমিশনার নিয়ে গঠিত ছিল। অর্ডিন্যান্সের বিধি-বিধান এবং এর অধীনে প্রণীত আইন অনুসারে কমিশনাররা প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হতেন। নির্বাচিত কমিশনারদের মধ্য থেকে এক জনকে মেয়র এবং তিন জনকে ডেপুটি মেয়র হিসেবে বাছাই করা হতো। মেয়র এবং ডেপুটি মেয়রগণ করপোরেশনের কমিশনার হিসেবেও গণ্য হতেন। কমিশনারদের কার্যকালের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।

তবে আবুল হাসনাতের পর ১৯৮৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে দুই জন প্রশাসক করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান। ঐ বছরের ৯ অক্টোবর থেকে ৯০-এর ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মো. নাজিউর রহমান মঞ্জু মনোনীত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ঢাকা সিটি করপোরেশন

১৯৯০ সালে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র (মনোনীত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৩ ডিসেম্বর ১৯৯০ থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। এক্স অফিসীয় মেয়র হিসেবে অলিউল ইসলাম ও বদিউর রহমান দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালের ১৯ মে থেকে ১৯৯৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনীত মেয়র হিসেবে নগর প্রধানের আসনে ছিলেন মির্জা আব্বাস।

১৯৯৩ সালে ‘ঢাকা সিটি করপোরেশন (সংশোধনী) আইন, ১৯৯৩’ জারি করা হয়। এ আইনে মেয়র এবং কমিশনারগণ প্রাপ্তবয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন। নতুন আইনে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৪ সালে এবং ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে একজন মেয়র ও অন্য কমিশনাররা নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ সালে সংরক্ষিত ৩০টি আসনে মহিলা কমিশনারদের প্রত্যক্ষ নির্বাচনের বিধান প্রবর্তন এবং মহানগরের ওয়ার্ড সংখ্যা ৯০টিতে উন্নীত করা হয়। অবিভক্ত ঢাকায় মোহাম্মদ হানিফ ও সাদেক হোসেন খোকা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। মেয়র খোকা ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। তাকে সরানোর পথ সৃষ্টি করতেই এক ডিসিসিকে ভেঙে দুই ডিসিসিতে পরিণত করা হয়।

১০ অঞ্চলে বিভক্ত ঢাকা

১৯৯৩ সালে জারিকৃত আইন অনুযায়ী সরকার ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ১০টি অঞ্চলে বিভক্ত করে। আইনের ধারায় বলা হয়, উন্নততর প্রশাসন এবং করপোরেশনের কার্যাবলি অধিকতর সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য সরকার শহরটিকে এমন সংখ্যক অঞ্চলে বিভক্ত করতে পারবেন যেমনটির প্রয়োজন সরকার যথোপযুক্ত বলে বিবেচনা করবেন। প্রতিটি অঞ্চলের জন্য একটি করে আঞ্চলিক অফিস স্থাপন করা হয় এবং তা মেয়রের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে করপোরেশনের দেওয়া দায়িত্ব পালন করবে।

এক ঢাকা, দুই করপোরেশন

২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর স্থানীয় সরকার সংশোধনী বিল ২০১১ অনুসারে সরকার পূর্ববর্তী ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। এ আইন অনুযায়ী ৪ ডিসেম্বর ২০১১ থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুইটি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পাঁচটি অঞ্চল ও ৫৭টি ওয়ার্ড এবং উত্তর সিটি করপোরেশন পাঁচটি অঞ্চল ও ৩৬টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। আজ এই দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। ইভিএম ভোটে নতুন নগর পিতা বাছাই করবেন নাগরিকরা।

ইত্তেফাক/কেকে