অ্যান্ড্রু জনসন এবং বিল ক্লিনটনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হইতে চলিতেছেন, যিনি কংগ্রেসের একটি কক্ষে ইমপিচড হইবার পরও স্বপদে বহাল থাকিবেন। তাহার ক্ষেত্রেও ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া সিনেটে থমকাইয়া যাইতে পারে, যেমনটি আগের দুই প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে ঘটিয়াছিল।
ট্রাম্প অভিশংসন হইতে বাহির হইয়া আসিবেন, ইহা ইতিপূর্বেই ধারণা করা হইয়াছিল; কিন্তু ট্রাম্পকে যে অভিশংসনের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইতেছে—ইহাই অনেক বড়ো ব্যাপার। অগ্রসর গণতন্ত্রের সেবক যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রেসিডেন্টের জন্য ইহা কম অপমানের নহে; কিন্তু এইসকল বিষয়ও ছাপাইয়া গিয়াছে অভিশংসনের বিচার প্রক্রিয়ার কিছু ঘটনা। হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের মতো সিনেটেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব করাইতে সম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা করিয়াছিল বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। এইজন্য সপ্তাহ ধরিয়া তাহারা মরিয়া হইয়া ছিলেন যে কোনো উপায়ে হউক ট্রাম্পের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় তুলিতে। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের দরকার ছিল ৫১ জন সাক্ষী। নিজেদের ৪৭ জনের বাহিরে রিপাবলিকানদের কমপক্ষে চার জনের সমর্থন দরকার ছিল ডেমোক্র্যাটদের। অবশ্য সুজান কলিন্স, মিট রোমনিরা রাজি হইয়া গেলেও, শেষ মুহূর্তে বাঁকাইয়া বসেন টেনিসির সিনেটর লামার অ্যালেকজান্ডার। অন্যদিকে ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের নাম সাক্ষী হিসাবে সিনেটে হাজির করিবার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছিল ডেমোক্র্যাটরা। সাক্ষী হিসাবে জন বোল্টন ছিলেন ডেমোক্র্যাটদের তুরুপের তাস। তিনি ৫১৯ দিন ধরিয়া ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করিয়াছেন; কিন্তু সম্প্রতি তিনি ঘোষণা করিয়াছেন ৫১৯ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশ করিবেন, যাহার শিরোনাম—‘দি রুম হয়্যার ইট হ্যাপেন্ড: এ হোয়াইট হাউজ মেমোইর।’ সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের উপর চাপ সৃষ্টি করিয়াছিলেন, যাহার বিনিময়ে ট্রাম্প ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তার ছাড় করিবার প্রতিশ্রুতি দেন—এমন ভয়ংকর তথ্যও রহিয়াছে জন বোল্টনের প্রকাশিতব্য বইতে। ইহার বাহিরে ৫২৮ পৃষ্ঠার এই বইটিতে এমন অনেক স্পর্শকাতর তথ্য রহিয়াছে, যাহাকে প্রকাশ্যে না আনিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাইতেছেন ট্রাম্প। বইটি প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ আগামী ১৭ মার্চ থাকিলেও দুই দিন পূর্বে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাইয়াছে, বইটি হয়তো কোনোদিনই আলোর মুখ নাও দেখিতে পারে। অন্যদিকে সাক্ষী হিসাবে জন বোল্টনকে আটকাইয়া দেওয়া হইয়াছে। বিষয়টি লইয়া তুমুল তর্কবিতর্ক হইয়াছে গণমাধ্যমে। স্বাভাবিক ভাবে নূতন সাক্ষীর অভাবের ফায়দা লুটিতেছে ট্রাম্পের দল। ধারণা করা হইতেছে—এমন পরিস্থিতিতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সিনেট হইতে ক্লিনচিট পাইয়া যাইবেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রকে মনে করা হয় বিশ্বের সকলের চাইতে অগ্রসর গণতন্ত্রের সেবক দেশ; কিন্তু এমন অগ্রসর গণতন্ত্রের দেশেই এমন সকল ঘটনা আমরা প্রতিনিয়তই ঘটিতে দেখিতেছি, যাহার তুলনায় তৃতীয় বিশ্বের কথিত গণতান্ত্রিক দেশসমূহের লজ্জা পাইবার কিছু থাকে না। ‘ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা’ গ্রন্থের বিখ্যাত লেখক অ্যালজিস ডি টোকুইভিল বহুপূর্বেই জানাইয়াছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের মধ্যে বেশ কিছু প্রতিকূল চিত্র রহিয়াছে, যাহার আলামত সময়ে সময়ে দৃশ্যমান হয়। এই মুহূর্তে সাক্ষীকে আটকাইয়া ট্রাম্প না হয় অভিশংসন হইতে মুক্ত হইতে যাইতেছেন; কিন্তু আমেরিকার অগ্রসর গণতন্ত্র কি তাহাতে পিছাইয়া যাইতেছে না?