পরিবর্তন নিশ্চয়ই আসিবে

যুদ্ধই যখন মুনাফা ও কর্তৃত্বের সবচাইতে বড়ো পুঁজি, তখন যুদ্ধ তো জিয়াইয়া থাকিবেই। ছড়াইয়া পড়িবেই পরাশক্তিদের প্রয়োজন মতো। পরাশক্তিবাদীদের নিকট ‘যুদ্ধ’ এমনই অতি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। এই জন্য বিশ্বব্যাপী অন্তত ৯২টি দেশে অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করিতেছে। তৈরি হইয়াছে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। বহুদিন ধরিয়া যুদ্ধে দামামা বাজাইয়া চলিতেছে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া প্রভৃতি দেশে। যাহাদের ছিল অঢেল প্রাচুর্য, সমৃদ্ধ জীবন, তাহাদের আজ পথের ভিখারি বানানো হইতেছে। তাহারা অস্ত্রধারী নহে, তাহার পরও এই সকল নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষকে নারী-শিশুনির্বিশেষে হত্যা করা হইতেছে নির্মমভাবে। হত্যার জন্য ব্যবহার করা হইতেছে আধুনিক সকল অস্ত্র, যাহা ক্রয় করা হইতেছে জনগণের ট্যাক্সের অর্থ দিয়াই। নিরস্ত্র মানুষগুলি আর তাহাদের শিশুরা যে কত কষ্ট ভোগ করিতেছে তাহা বর্ণনার ভাষা আমরা যেন হারাইয়া ফেলিয়াছি।

আমরা দেখিয়াছি, গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক হইতে পশ্চিম এশিয়া তথা মধ্যপ্রাচ্যে কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে হস্তক্ষেপ করিয়াছে পরাশক্তিধরেরা। ইহার নেপথ্যে রহিয়াছে মূলত তিনটি কারণ। প্রথমত, ঐ অঞ্চলের উপর নিজেদের প্রভাব অটুট রাখিতে; দ্বিতীয়ত, তেলের ভান্ডারে নিজেদের তেল সংস্থাগুলির একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখিতে; এবং তৃতীয়ত সেইখানকার দেশগুলিতে নিজেদের অস্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির রপ্তানি চালু রাখিতে পরাশক্তিরা একের পর এক পদক্ষেপ লইয়াছে। আমরা দেখিতে পাইয়াছি, সন্ত্রাসবিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের নামে পেট্রো-ডলারের সুবিধাকে ব্যবহার করিয়া ন্যাটো এবং কিছু আরব দেশ ও তাহাদের ইউরোপীয় মিত্ররা মিলিয়া সিরিয়া ও তাহার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে বানাইয়াছে একটি লাশের সমুদ্র। সেইখানের নিরস্ত্রদের হত্যার জন্য কোনো নিয়মনীতিরই তোয়াক্কা করা হয় না।

তবে বিশ্বব্যাপী যেইভাবে অস্থিরতা ক্রমশ মাকড়সার জালের মতো ছড়াইয়া পড়িতেছে, তাহার উত্তাপ হইতে কেহই মুক্তি পাইবে না। বলা হইয়া থাকে, এই নবতর অস্থিরতার সূত্রপাত ২০০১ সালের এগারোই সেপ্টেম্বরে। সেইদিন নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে ভয়াবহ হামলার পর ‘সন্ত্রাস নির্মূলে’ বিশ্বব্যাপী শুরু হয় তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ। ইহার পাশাপাশি নাইন-ইলেভেনের ঘটনাটি দীর্ঘদিনের জাতিদ্বন্দ্বগত বহু রাষ্ট্রের অন্দরে ক্যাটালিস্টের মতো ভূমিকা পালন করে। আমরা দেখিতেছি ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব নব-নবরূপে এবং নূতন স্বীকৃতির মাধ্যমে আরো প্রতিষ্ঠা লাভ করিতেছে। একটি জাতিগোষ্ঠীকে তিলে তিলে শেষ করা হইতেছে স্লো পয়জনের মতো। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হইল, নিজ নিজ ভূখণ্ডে ‘মানবতার ধারক’ এই পরাশক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ অন্য রাষ্ট্রের কিছু কিছু জাতিগোষ্ঠীর উপর দমন-পীড়ন ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালাইবার ঢালাও অনুমোদন দিতে দ্বিধা করে না! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠন করা হইয়াছিল জাতিসংঘ, কথা ছিল সেইখানে উন্নত, অনুন্নত, ধনী, দরিদ্র—সকল রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা নিজেদের কথা বলিতে পারিবে; কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করিয়া নষ্ট করা হইয়াছে জাতিসংঘের মূল শক্তিকে। পরাশক্তিরা এখন জাতিসংঘকে পাশ কাটাইয়াও নিজের পছন্দানুযায়ী সিদ্ধান্ত লইতে দ্বিধা করে না। সুতরাং বিশ্ব যেন মানবের তরে না হইয়া দানবের তরে হইয়া উঠিতেছে।

এইভাবে চলিতে পারে না। পরিবর্তন নিশ্চয়ই আসিবে। আসিতেই হইবে। কারণ, এই বিশ্ব দানবের তরে নহে, মানবের তরে।