শিল্প ও কৃষিতে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ব্যবহার

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনৈতিক নীতিবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক স্টিফান ডারকন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘পাবলিক লেকচার’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখিবার সময় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য খাতে অটোমেশন তথা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহারে পরামর্শ দিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, ‘চাকচিক্যময় প্রকল্পের পরিবর্তে প্রয়োজন বিবেচনায় রাখিয়া সঠিক প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করা সম্ভব।’ সেই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন দরিদ্র দেশের অটোমেশনের ইতিবাচক ফলাফলের কথা উল্লেখ করিয়াছেন।

আমাদের দেশে দীর্ঘকাল ধরিয়া কিছু কিছু ক্ষেত্র ছাড়া অন্য সর্বক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় মেশিন ব্যবহারে নিরুত্সাহিত করা হইয়া থাকে। ইহার প্রধান কারণ মনে করা হয় যে মেশিন সর্বক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় হইলে লোকবল কম লাগিবে এবং বেকার সমস্যা বাড়িয়া যাইবে। কিন্তু ইহা একটি ভ্রান্ত ধারণা। সে কথা অধ্যাপক ডারকনও উল্লেখ করিয়াছেন। পৃথিবীর বহু দেশে শিল্প প্রায় শতভাগ স্বয়ংক্রিয় হইবার পরও বেকার সমস্যা তৈরি হয় নাই। হয়তো শ্রমিকদের শিল্প খাত হইতে কৃষি খাতে অথবা লাইফস্টক বা ফিশারিজ খাতে স্থানান্তরিত হইয়াছে। যদিও ঐ খাতগুলোতেও বর্তমান বিশ্বে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির ব্যবহার চলিতেছে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ব্যবহারও সামনে চলিয়া আসিয়াছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গার্মেন্ট এবং গুটি কয়েক শিল্পকারখানার অটোমেশনের ব্যাপারে নীতিনির্ধারকগণ নেতিবাচক প্রভাবের চিন্তা করিয়া থাকেন। কিন্তু গভীরে তাকাইলেই দেখা যাইবে, যাহাদের শিল্প খাতে প্রয়োজনীয়তা ফুরাইয়া যাইবে তাহারা শিগিগরই কৃষি, যোগাযোগ, পর্যটন, সমুদ্রসম্পদসহ আরো কয়েকটি ক্ষেত্রে স্থানান্তরিত হইতে পারিবে। তবে হ্যাঁ, ঐ জায়গাগুলোও স্বয়ংক্রিয় করিতে পারিলে উত্পাদন বহুগুণ বাড়িয়া যাইবে। দেশে যদিও বর্তমানে কৃষির ক্ষেত্রে রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার, রিপার, ব্লেড প্ল্যান্টার এবং কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহার হইতে শুরু করিয়াছে। কিন্তু তাহা এখনো সর্বক্ষেত্রে পৌঁছায় নাই।

চরম বাস্তবতা হইল, এখন প্রতিযোগিতার যুগ, রোবোটিকসের যুগ। শিল্প, কৃষিসহ সব ধরনের উত্পাদনের ক্ষেত্রে অটোমেশনের কোনো বিকল্প নাই। ঐ প্রতিযোগিতায় নাম না লেখাইলে সকলকে লইয়াই মরিতে হইবে। উন্নত বিশ্ব শিল্প, কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার এবং পরবর্তী সময়ে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করিয়াছে। তাহারা এখন ম্যানেজারিয়াল কর্মকাণ্ড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর ছাড়িয়া দিবার পথে অগ্রসহ হইতেছে। এমন সময় আমরা শুধু দুই হাত আর পেশি ব্যবহারে নিয়োজিত থাকিতে পারি না। তাহা হইলে ডুবিতে হইবে গোটা জাতিকে। সুতরাং সর্বক্ষেত্রে অটোমেশনকে উত্সাহিত করিতে হইবে। দেশে উত্পাদন বাড়িলে তাহার সুফল প্রতিটি ঘরেই পৌঁছাইয়া থাকে। বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে  যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হইয়াছে। কিন্তু যন্ত্র ক্রয়ের ব্যয়, বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ও সাশ্রয়ী সরবরাহের অভাবসহ আরো কিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে যন্ত্রের ব্যবহারে মন্থর গতি পরিলক্ষিত হইতেছে। আমরা মনে করি, সকল ক্ষেত্রে অটোমেশন তথা পণ্য উত্পাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অধিক উত্সাহিত করিতে হইবে। কৃষি ক্ষেত্রে যন্ত্র ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া যাইতে পারে।