গত মঙ্গলবার ছিল বিশ্ব ক্যানসার দিবস। এই দিবস পালনকালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও—হু) এক সতর্কবার্তা জারি করিয়াছে। তাহারা বলিয়াছেন যে, প্রতিরোধ ও চিকিত্সাসেবায় বিনিয়োগের অভাবে ২০৪০ সালের মধ্যে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে প্রাণঘাতী ক্যানসারের প্রকোপ ৮১ শতাংশ বৃদ্ধি পাইতে পারে। এই তথ্য আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য উদ্বেগের বড়ো কারণ। কারণ ক্যানসারে মৃত্যুর হার এইসব দেশে সর্বোচ্চ হইলেও ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের এখনো প্রস্তুতির যথেষ্ট অভাব রহিয়াছে। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলি সংক্রামক ব্যাধি এবং মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হার রোধে অধিক ব্যস্ত রহিয়াছে। স্বাস্থ্য খাতের একটি বিরাট অংশ অর্থবরাদ্দ এই ক্ষেত্রে দেওয়ার কারণে বাংলাদেশে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার আগের তুলনায় হ্রাস পাইয়াছে, যাহা ইতোমধ্যেই বিশ্বে প্রশংসিত হইয়াছে; কিন্তু ক্যানসার, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদি অসংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে এখনো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গৃহীত হয় নাই।
ক্যানসার আসলে কী? আমরা জানি, মানব শরীর অসংখ্য ছোটো ছোটো কোষের মাধ্যমে তৈরি। কোষগুলো একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর মারা যায়। পুরাতন কোষের জায়গায় নূতন কোষ জন্ম নেয়। যখনই এই কোষগুলি কোনো কারণে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়িতে থাকে, তখনই ত্বকের নিচে মাংসের দলা অথবা চাকা দেখা দেয়। ইহাকেই বলে টিউমার। আর এই টিউমার বেনাইন (নির্দোষ) বা ম্যালিগন্যান্ট (ক্ষতিকর) উভয়ই হইতে পারে। এই ক্ষতিকর টিউমার হইতেই ছড়ায় ক্যানসার। তবে প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়িলে অনেক ক্যানসারই নিরাময়যোগ্য। এই জন্য দরকার স্বাস্থ্যসচেতনতা। শেষমুহূর্তে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হইলে চলিবে না। উন্নত বিশ্বে ক্যানসার আক্রান্ত মানুষের শতকরা ৫০ ভাগই এখন নিরাময় লাভ করেন; কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল বিশ্বের অসুবিধা হইল অসচেতনতার পাশাপাশি তামাকের অসতর্ক ব্যবহার, ভেজাল খাদ্যের ছড়াছড়ি ও অত্যাধুনিক চিকিত্সা-সুবিধার অপ্রতুলতা বিদ্যমান। এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বত্সর দেড় লক্ষ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। ইহাতে মৃত্যুবরণ করে ১ লক্ষ ৮ হাজার মানুষ। অথচ এইজন্য রাজধানীতে দেশের একমাত্র বিশেষায়িত একটি ক্যানসার হাসপাতাল রহিয়াছে যাহা ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট। তাই ক্যানসার চিকিত্সার বিকেন্দ্রীকরণের উপর আমাদের গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।
এই বত্সর হুর প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, আগামী দশকে আড়াই হাজার কোটি ডলার (২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ করিতে পারিলে ৭০ লক্ষ ক্যানসার রোগীর জীবন বাঁচানো যাইতে পারে। তথ্যমতে, ২০৪০ সাল নাগাদ সারাবিশ্বে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইতে পারে, তাই এই চিকিত্সার জন্য আমাদের বাজেট বাড়াইতে হইবে। দেশে এই রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে বড়ো চ্যালেঞ্জ হইল রোগ শনাক্তকরণ ও সঠিক পরীক্ষানিরীক্ষা। আমাদের জানা দরকার, স্তন ক্যানসারসহ অনেক ক্যানসারই প্রাথমিক চিকিত্সায় ভালো হয়। জরায়ুর ক্যানসার প্রতিরোধে যে টিকা আবিষ্কার করা হইয়াছে তাহা বাংলাদেশেও সুলভ। এখন দরকার এই চিকিত্সাব্যবস্থাকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়া যাওয়া। এই জন্য দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট ক্যানসার চিকিত্সাকেন্দ্র নির্মাণে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়াছে, তাহার দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।