জাল নথিতে জামিন-বাণিজ্য

জালিয়াত চক্রের চার জন গ্রেফতার, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

g বিশেষ প্রতিনিধি

ওরা চার জন। কোনো একসময় উচ্চ আদালতে বিভিন্ন উকিলের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। হারুন রশিদ ওরফে হারুন, দেলোয়ার হোসেন, এ বি এম রায়হান ও শামীম রেজা। তারা নিম্ন আদালতে কোনো আসামির জামিন আটকে গেলে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিত। মামলার এজাহার-অভিযোগপত্র এবং আদালতের নথি জালিয়াতি করে উচ্চ আদালত থেকে জামিনের ব্যবস্থা করত। বিনিময় নিত ৫ লাখ টাকা। গত কয়েক বছরে জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন আদালত থেকে অন্তত ৫০ জন আসামির জামিনের ব্যবস্থা করেছে তারা। শেষটায় চরমপন্থি দলের আঞ্চলিক কমান্ডারকে জামিনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার পরই ধরা পড়ে তাদের জালিয়াতির কথা। এরপর তারা আত্মগোপনে চলে যায়। সিআইডি পুলিশ (পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট) দীর্ঘ চেষ্টার পর তাদের রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে থেকে গ্রেফতার করে। সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে তারা জালিয়াতির নানা কথা। বলেছে তাদের চক্রের আরো বেশ কয়েকজন সহযোগীর নাম-ঠিকানা।

এ ব্যাপারে সিআইডি ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ২০১৪ সালে রাজবাড়ী থেকে চরমপন্থি দলের আঞ্চলিক কমান্ডার ইয়ার আলীকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর এ বছরেরই নভেম্বর মামলার একমাত্র আসামি হিসেবে তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এ মামলায় আসামি ইয়ার আলীকে নিম্ন আদালতে জামিন নাকচ করে দিলে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়। ২০১৭ সালে উকিল মুসরোজ ঝর্ণা সাথীর মাধ্যমে একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ইয়ার আলীর ছয় মাসের জামিন দেন।

চরমপন্থি দলের আঞ্চলিক কমান্ডারের জামিন পাওয়ার বিষয়টি খটকা লাগে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ আহম্মেদের। তিনি রাজবাড়ীর আদালত থেকে মামলার মূল কাগজপত্র তলব করেন। এরপর সেসব কাগজপত্র এবং উচ্চ আদালতের কাগজপত্র মিলিয়ে দেখলে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। পরবর্তীকালে তিনি এসব কাগজপত্র পেশ করলে আসামির জামিন বাতিলসহ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দেন আদালত।

জালিয়াতির বিষয়ে সিআইডির এ কর্মকর্তা বলেন, জামিন আবেদনে মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্র নকল করে পালটে ফেলেন চক্রের সদস্যরা। ওই মামলায় আসামি এক জন থাকলেও নকল কপিতে দুই জন আসামি দেখানো হয় এবং প্রধান আসামি ইয়ার আলীকে দুই নম্বর আসামি দেখানো হয়। ২০১৬ সালে জামিন আবেদনের আইনজীবী ঝর্ণা সাথী ও তার সহযোগী শাহিনুর রহমানকে আসামি করে একটি মামলা করা হয়। মামলায় দুই জনের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযোগপত্র দিলে ২০১৭ সালে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডিতে পাঠানো হয়।

ধারাবাহিক তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত ৯ জানুয়ারি উকিল ঝর্ণা সাথীর সহযোগী হারুনকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে তার দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ৩ ফেব্রুয়ারি রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে চক্রের মূলহোতা দেলোয়ারসহ তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন আদালতের বিচারক, আইনজীবীদের বিপুল পরিমাণ নকল সিল ও বিভিন্ন নথি উদ্ধার করা হয়েছে।

জালিয়াতির প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিশেষ পুলিশ সুপার বলেন, আসামিদের জামিনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের টাকায় চুক্তিবদ্ধ হত চক্রের সদস্যরা। এ হিসেবে ইয়ার আলীর জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। এরপর মামলার কাগজপত্র পাঠানো হতো রংপুরে চক্রের সদস্যদের কাছে। সেখানে বসে নকল কাগজপত্র তৈরি করে ঢাকায় পাঠানো হতো। এরপর ঢাকায় অবস্থান করা চক্রের সদস্যরা উচ্চ আদালতের উকিলের মাধ্যমে আদালতে জামিন আবেদন করাতেন।

বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত আরো ছয় জনের নাম আমরা পেয়েছি। আশা করছি খুব শিগিগর তাদেরও গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। আসামি ঝর্ণা সাথী বর্তমানে জামিনে রয়েছেন এবং চরমপন্থি নেতা ইয়ার আলী ওই মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে জেলে আছেন বলেও জানান তিনি।