চীনের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বাংলাদেশেও

করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চীনের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করে ফেলেছে। এর প্রভাব পড়েছে চীনের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। চীনের সঙ্গে আকাশ ও জলপথে যোগাযোগে সতর্কতা নিয়েছে বাংলাদেশও। ইতিমধ্যে চীনের নাগরিকদের জন্য অন অ্যারাইভাল ভিসা (বাংলাদেশে আসার পর তাত্ক্ষণিক ভিসা প্রদান) সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের যাতায়াত একেবারে তলানিতে নেমে এসেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরেও এ বিষয়ে সর্তকতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে চীন থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানির প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও স্থানীয় ভোগ্যপণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

শিল্পোদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের সরাসরি বিনিয়োগ রয়েছে। আবার কিছু প্রকল্পে সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করছে। এসব প্রকল্পের বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি চীন থেকে আমদানি হয়। যেসব যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা হয়েছে, এসব যন্ত্রপাতির বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই সরবরাহ প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সহসভাপতি এ টি এম আজিজুল আকিল ইত্তেফাককে বলেন, এর ফলে দুই বিলিয়ন ডলারের                  জাহাজীকরণ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ওখান থেকে আমদানির অর্ধেকের বেশি শিল্পের কাঁচামাল। এগুলো সময়মতো জাহাজীকরণ না হলে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গত ৩১ জানুয়ারি চীনের চন্দ্র মাসের ছুটি শেষ হওয়ার পর তা আরো বাড়ানো হয়েছে। চীনের রপ্তানিকারকরাও পণ্য পাঠানোর সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ জানাতে পারছে না। সবমিলিয়ে চলতি মাসে যদি করোনা ভাইরাসের সমস্যা থাকে—তাহলে আমাদেরও বড়ো আকারের ক্ষতি হতে পারে।

এদিকে, গতকাল সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

চীন থেকে কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্য আমদানিতে দেরি হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, আমাদের ওভেন পোশাকের ফেব্রিকের ৬০ শতাংশই আসে চীন থেকে। ছুটি বাড়ানোয় স্বাভাবিকভাবেই কাঁচামাল আসতে দেরি হতে পারে। এর ফলে সঠিক সময়ে পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে না। ফলে জাহাজীকরণ ব্যর্থ হয়ে বেশি ভাড়ায় আকাশ পথে পাঠানোর পাশাপাশি বাধ্য হয়ে বায়ারকে ডিসকাউন্টও দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে উদ্যোক্তারা। অন্যদিকে চীন থেকে ক্রেতারা সরে গেলে ঐ সুবিধার কিছু অংশ বাংলাদেশও পেতে পারে বলে কিছুটা আশার কথাও শুনিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে এ ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদে থাকলে তা বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য তথা স্থানীয় বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। 

বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন করোনা ভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের জন্য তিনটি ঝুঁকি দেখছেন। এর মধ্যে সময়মতো কাঁচামাল বা এক্সেসরিজ না এলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, মূলধনী যন্ত্রপাতি আসতে দেরি হলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়া ও বাংলাদেশে বাস্তবায়নাধীন বড়ো প্রকল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়া।  ইত্তেফাককে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৬ শতাংশই আমদানি হয় চীন থেকে। এর মধ্যে রপ্তানির অনেক পণ্য চীন থেকে আমদানি করতে হয়। যেসব পণ্যের ঋণপত্র খোলা হয়েছে—সময়মতো তা উদ্যোক্তাদের হাতে না এলে ইউরোপ ও আমেরিকায় রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ চীন বাকি বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এমনিতেই আমরা লিড টাইমে পিছিয়ে রয়েছি। এটি আলাদা ঝুঁকি তৈরি করবে। তিনি বলেন, চীন থেকে অন্যান্য বাণিজ্যিক ও ভোগ্যপণ্যের পাশাপাশি আদা-রসুনও আমদানি হয়। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে আদা-রসুনের মজুত বেড়েছে। দাম বাড়া শুরু হয়েছে। এটি দেশে মূল্যস্ফীতির কারণ হতে পারে।

দেশের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ১৩ হাজার চীনের নাগরিক কাজ করেন। ছুটির কারণে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই এখন চীনে রয়েছেন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। এর মধ্যে বাংলাদেশ চীন থেকে আমদানি করেছে ১৩ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার আর রপ্তানি করেছে মাত্র ৮৩১ মিলিয়ন বা (০.৮৩ বিলিয়ন) ডলার। গত বছর চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানির বেশির ভাগই তৈরি পোশাক। এরই মধ্যে সেখানে অনেক স্টোর বন্ধ হয়ে থাকায় বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানিও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর আমদানির তালিকা বেশ দীর্ঘ। এর মধ্যে গার্মেন্টসের ফেব্রিক, সুতা, এক্সেসরিজ, বিভিন্ন ধরনের মূলধনী যন্ত্রপাতি ছাড়াও স্থানীয় বাজারের জন্য ব্যবহার উপযোগী স্টিল, প্রসাধনী, কাচের তৈজসপত্র, প্লাস্টিকসহ বহু পণ্য রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে বিপাকে থাকা চীনের অর্থনীতি করোনা ভাইরাসের ফলে ফের বড়ো ধরনের ধাক্কা খেতে যাচ্ছে বলে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা আভাস দিয়েছে। এই ভাইরাস বিস্তার প্রতিরোধ ও উদ্ধার কর্মসূচির আওতায় কর হ্রাস, ব্যয় বৃদ্ধি এবং সুদ হার কমাতে বাধ্য হতে পারে চীন। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের বিশাল অঞ্চলে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার কারণে চলতি প্রান্তিকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হার ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে যেতে পারে। গত বছর দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিল গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। অর্থনীতির ক্ষতি সামলাতে এরই মধ্যে চীনের নীতিনির্ধারকরা কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিশেষ করে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে যেসব ব্যবসা-বাণিজ্য বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেগুলোকে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং ব্যক্তি ঋণের সুদ কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বৃহত্ ব্যাংকগুলো। ব্যাংক অব চায়না বলেছে, উহানসহ গোটা হুবেই প্রদেশের বাসিন্দাদের মধ্যে যারা আয়ের উত্স হারাবেন তাদের ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হবে। অনেক বিশ্লেষক এবারের ক্ষতি সার্স ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময়কার চেয়েও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা করছেন। করোনা ভাইরাসের দ্রুত বিস্তার এরই মধ্যে বিদ্যমান কর্মসংস্থানকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের বন্য প্রাণীর বাণিজ্য বন্ধ করার দাবি জোরালো হচ্ছে বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।