ব্যবসায়-বাণিজ্যে সততার মূল্য রহিয়াছে। ব্যবসায়ীরা সততার সহিত দেশের স্বার্থ রক্ষা করিয়া নিজ নিজ বাণিজ্য চালাইয়া যাইবেন, ইহাই প্রত্যাশিত। কিন্তু অনেক সময় ইহার ব্যত্যয় ঘটিতে দেখা যায়। ব্যবসায়ীদের কেহ কেহ অধিক মুনাফার লোভে দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়া থাকেন, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করিয়া থাকেন। তেমনি অভিনব এক পদ্ধতিতে সরকারকে ফাঁকি দিয়া দেশের বাইরে অর্থ পাচার তথা মানি লন্ডারিংয়ের খবর সম্প্র্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আসিতেছে। একটি অসাধু চক্র মিথ্যা ঘোষণায় স্বল্প মূল্যের পণ্য অধিক মূল্য দেখাইয়া এলসি বা ঋণপত্র খুলিয়া বৈধ চ্যানেলে ঋণপত্রের সম্পূর্ণ অর্থ পাচার করিতেছে। কখনো পণ্যের নামে বালু, মাটি, পাথর কিংবা ছাই আনিয়া, আবার কখনো আমদানির নামে একেবারে খালি কনটেইনার আনা হইতেছে অর্থ পাচারের উদ্দেশে। গত কয়েক বত্সরে এই প্রবণতা আরো বৃদ্ধি পাইয়াছে। মূলত ইহা চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে ঘটিয়া থাকে। বন্দরে স্ক্যানিংসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামোর অপ্রতুলতায় ইহা রোধ করা কঠিন হইতেছে। তাহার পরও অনেকগুলো ভুয়া চালান বন্দর কর্তৃপক্ষ শনাক্ত করিতে সক্ষম হইয়াছেন। যেমন—চীন হইতে পলিয়েস্টার সুতা আমদানির ঘোষণা দিয়া আনা হইয়াছে দুই কনটেইনার বালু। আর ইহার মাধ্যমে প্রায় ৪৩ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করা হইয়াছে বলিয়া ধারণা করিতেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তেমনি তুলা, কাগজ, মাশরুম, ইস্পাত, সরিষার পরিবর্তে আনা হইয়াছে পাথর, সিমেন্ট, বালু, মাটি ইত্যাদি। তবে ইহার একটি বিপরীত দিকও রহিয়াছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকের প্রতারণার শিকারও হইতেছেন দেশের আমদানিকারকরা। ঘোষণা অনুযায়ী পণ্য না পাইয়া দেউলিয়া হওয়ার ঘটনাও ঘটিতেছে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গিয়াছে, চট্টগ্রাম বন্দরে গত বত্সরে একটি মানি লন্ডারিং ইউনিট খোলা হইয়াছে। কিন্তু এই ইউনিটে মামলা দায়েরের সংখ্যা খুবই নগণ্য। এই ধরনের অর্থ পাচারের ঘটনা ধরা পড়িবার পর জড়িত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। অনেক সময় মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করাও কঠিন হইয়া পড়ে। এই জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি ঝুলিয়া থাকে অথবা দীর্ঘায়িত হয়। আর এই সুযোগে অসাধু আমদানিকারক বা পাচারকারী চক্র আরো তত্পর বা বেপরোয়া হইয়া উঠে।
সরকার ব্যবসায়-বাণিজ্যের পথ প্রসারিত করিয়াছে। সরকারের কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্তের অপব্যবহার কাম্য নহে। দ্বিতীয়ত, সরকারকেও এই ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। আইনি জটিলতা কমাইয়া আনিয়া দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করিতে হইবে। বন্দরের স্ক্যানিংসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নত করিতে হইবে, যাহাতে কর্তৃপক্ষের নজর ফাঁকি দেওয়া না যায়। পাশাপাশি দেখিতে হইবে যেন সরিষার মধ্যে ভূত না থাকিয়া যায় অর্থাত্ অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বন্দরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ না থাকে তাহাও নিশ্চিত করিতে হইবে।