চীনে প্রাণঘাতী নভেল করোনা ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশে। প্রকৌশলী-শ্রমিক-অপারেটর সংকটের কারণে পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্রের বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরুর কাজ থমকে গেছে। প্রকল্পে নিয়োজিত সিংহভাগ চীনা কর্মী ফিরতে পারছেন না বাংলাদেশে। ভাইরাসজনিত সংক্রমণ রোধে এ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে বিদ্যুত্ খাতের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিকটবর্তী সময়ে বাস্তবায়নের পথে থাকা পায়রা বিদ্যুেকন্দ্রে কবে নাগাদ উত্পাদন শুরু হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০১৬ সালে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ধানখালী ইউনিয়নের নিশানবাড়িয়ায় পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণকাজ শুরু হয়। এক বছর আগে এটি উত্পাদন শুরুর কথা থাকলেও গত ১৩ জানুয়ারি কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট পরীক্ষামূলক উত্পাদন শুরু করে। চলতি ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ৬৬০ মেগাওয়াটের ইউনিটটিতে বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরুর কথা ছিল। কিন্তু গত জানুয়ারিতে প্রকল্পে কর্মরত চীনা কর্মীরা চীনা নববর্ষ এবং শীতকালীন ছুটি উপলক্ষ্যে বার্ষিক ছুটিতে যান। এরপর করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। গত রবিবার থেকে বাংলাদেশে চীনা নাগরিকদের অন অ্যারাইভাল ভিসা বন্ধ করা হয়েছে। যদিও স্বাস্থ্যগত রিপোর্ট দেখানো সাপেক্ষে নিয়মিত ভিসায় আসা-যাওয়া অব্যাহত রয়েছে। এরপর চীন থেকে কয়েক জন বাংলাদেশে ফেরত এলেও সংক্রমণের আশঙ্কায় অধিকাংশই সেদেশে রয়ে গেছেন।
বিদ্যুেকন্দ্রটির মালিকানায় ও পরিচালনায় রয়েছে বাংলাদেশ-চীন পাওয়ার কোম্পানি (বিসিপিসিএল)। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কয়লাভিত্তিক পায়রা বিদ্যুেকন্দ্রে প্রায় ৬ হাজার কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার জনই চীনা নাগরিক। এদের মধ্যে তিন শতাধিক অপারেটর। এই অপারেটরদের মধ্যে ২৬৫ জনই ফিরে আসেননি। বর্তমানে বিদ্যুেকন্দ্রে কর্মরত আছেন ৫০ জনের মতো। এর বাইরে আরো ২৩ জন ফিরে এসে পৃথক স্থানে আলাদাভাবে (কোয়ারেন্টাইন) থাকছেন।
এ প্রসঙ্গে বিসিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম খোরশেদুল আলম বলেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট নির্মাণ শেষ হয়েছে। এখন প্রকৌশলের বিভিন্ন বিষয়ে সামঞ্জস্যতা তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু উত্পাদনের শুরুর দিকে অপারেশন পরিচালনার কথা চীনা প্রকৌশলী-কর্মীদের। তারা চীনে গিয়ে আটকে থাকায় আমাদের জন্য বড়ো ধাক্কা। প্রকল্প এলাকায় যারা রয়েছেন তারা চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে টিউনিং করার কাজ সারবেন। এর মধ্যে বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরুর উপায় খোঁজা হবে। তিনি বলেন, এখন যারা প্রকল্প এলাকায় আছেন তাদের মাধ্যমে হয়তো কেন্দ্রটি চালু করা যাবে কিন্তু কতদিন তা চালিয়ে নেওয়া যাবে তা বোঝা যাচ্ছে না। কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন ব্যবস্থা সমন্বয় করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
প্রকল্পে কর্মরত একজন বাংলাদেশি প্রকৌশলী বলেন, পায়রা বিদ্যুেকন্দ্রের প্রকৌশলগত কাজ চীনা নাগরিকরা সম্পন্ন করেছেন। উত্পাদন শুরুর জন্য অন্যান্য প্রকৌশলগত কাজগুলোও তারাই গুছিয়ে আনছিলেন। শুরুর দিকে উত্পাদন ব্যবস্থাও তাদেরই পরিচালনা করার কথা। পরে ধাপে ধাপে এতে বাংলাদেশি প্রকৌশলী-কর্মীরা যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবে চীনারা কাজে যোগদান করতে পারছেন না। হঠাত্ বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা এটি পরিচালনা করতে পারবেন না। ফলে বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরুর বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আসন্ন গ্রীষ্মে বিদ্যুত্ চাহিদা মেটাতে সরকারের বড়ো ভরসার জায়গা ছিল পায়রা বিদ্যুেকন্দ্র। এখন করোনা পরিস্থিতি দ্রুত প্রশমিত না হলে সংকট বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।