ইতিহাস-ঐতিহ্যে মোড়ানো প্রাচীন এক জনপদ সোনারগাঁ। এখানকার নদ-নদী কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে মানুষের মন-মন্দিরে। মেঘনা থেকে বহ্মপুত্র সংযোগ খাল মারীখালি। এই খালের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাত্ দেখা মেলে তরুণ এক মাঝির। নৌকার কানায় গিয়ে বসি। নৌকার অন্য প্রান্তে মাঝি বসা। তাকে জিজ্ঞাসা করি, কত দিন ধরে মাঝিগিরি কর?
মাঝি বলল, দাদার নয়—বাবার আমল থেকে। দাদার আমলে আমাদের প্রতাপ, প্রভাব, আত্মমর্যাদা বেশ ছিল। তখনকার যুগে জাঁকজমক পাটের কারবার ছিল। নানা হাজি বিল্লাল সরকারকে গাঁও-গ্রামের মানুষজন এক নামে চেনে। বৈশাখ থেকে আশ্বিন ছয় মাস খালে পানি থাকে—তখন মাঝি হই। কার্তিক থেকে চৈত্র পর্যন্ত ছয় মাস পানি থাকে না। খাল শুকিয়ে যায়। তখন এপার-ওপার বাঁশের সাঁকো, মাঝখানে নৌকা কষে বাঁধি।
মাঝিকে তার নাম জিজ্ঞেস করলে অকপটে বলে দিল পরিবারের সকলের নাম—মো. কবির হোসেন, মমিন হোসেন, বোন কবিতা, বাবা নোয়াব আলী, মা রত্না বেগম। তারা সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামের বাসিন্দা।
এই পরিবারের আয়ের উত্স নৌকা, লগি, বৈঠা। খেয়াঘাটের মাঝি কবিরের বাবা নোয়াব আলী। মমিন হোসেন ও কবির খেয়া পারাপার করে। ভোর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত লোক পারাপার করলে ৪০০-৫০০ টাকা আয় হয়। তবে কিছু মাসকাবারি টাকাও পায়। এতে তারা কোনোরকম সন্তুষ্ট। সংসার গোছাতে কবিরের মা ও ভাই বাড়িঘর সহায়-সম্বল বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। ফলে মা-ছেলে দুজনেই আবার গ্রামে ফেরেন। ছোটো বোন কবিতা ভবনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তাদের নেই ফসলের মাঠ, জমি বা বসতভিটা। সেই কিশোর বয়স থেকে নৌকা চালান নোয়াব আলী। তার ওপর তিনি প্রতিবন্ধী হয়েও জীবনযুদ্ধে হার মানেননি। কাক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাঁর এই জীবনযুদ্ধ। সন্তানের ওপর সবসময় ভরসাও করতে পারেন না। তাঁর শরীরে রোগ-ব্যাধি বাসা বেঁধেছে।
কবিরের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয় আমার। সে বলে, মাঝির খাতায় নাম তুলছি। তাতে কোনো সমস্যা নেই। গ্রামের ডাক্তার,
ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকের চাকরিজীবী, অ্যাডভোকেটকে নৌকা দিয়ে পার করেছি। আবার শিক্ষার্থীরা নৌকায় চড়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। এটাই আমাদের গর্ব। আর এই মারীখালি ‘বাদশাহী (রাজারা চলাচল করত) খাল’ নামে পরিচিত হলেও খনন করা প্রয়োজন।
নানা কর্মব্যস্ততায় আমরা নৌকায় পারাপার হয়ে থাকি। কিন্তু জানি না নৌকার মাঝির সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার কাব্য। কখনো টিভিপর্দায় বা ফেসবুকে দেখি, তখন আমরা হায় আফসোস করি কেউ কেউ...