অর্থমন্ত্রীর রহিয়াছে প্রতিবন্ধকতা

নিঃসন্দেহে দেশের বর্তমান অর্থমন্ত্রী একজন উচ্চশিক্ষিত এবং যোগ্য মানুষ। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করিবার সদিচ্ছাতেও কোনো কমতি নাই তাহার। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিবেশ তাহার জন্য কতটা অনুকূল উহা ভাবিয়া দেখিবার বিষয়। তাহার উপর দায়িত্ব পড়িয়াছে সমস্ত মেধা, অভিজ্ঞতা কাজে লাগাইয়া দেশের অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করিবার। তিনি ভালো করিয়া জানেন, ইতিবাচক ফলাফল আনিতে পারিলে প্রশংসা যেমন তাহার, তেমনি সফল হইতে না পারিলে সমস্ত দায় গিয়াও পড়িবে তাহার এবং সরকারপ্রধানের উপর। কিন্তু দেশের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র হইতে ইহাই ফুটিয়া উঠিতেছে যে, তিনি যেইভাবে যাহা করিতে চাহিতেছেন সেইভাবে করিতে পারিতেছেন না পারিপার্শ্বিক নানামুখী প্রতিবন্ধকতার জন্য। সেই হতাশা তাহার বক্তব্যেও ফুটিয়া উঠিতেছে। যেমন বৃহস্পতিবার একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপকদের বার্ষিক কনফারেন্সে তিনি বলিয়াছেন, ‘খারাপ কর্মকর্তাদের জন্য যখন একটি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন সমগ্র ব্যাংক খাতকেই ভুক্তভোগী হতে হয়। ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে সংসদে আমাকে গালি শুনতে হয়।’ মন্ত্রী মহোদয় ব্যাংক সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামাইয়া আনিতে চেষ্টা করিতেছেন অনেকদিন ধরিয়া। কিন্তু পারিয়া উঠিতেছেন না। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলি এতকাল ধরিয়া যে চড়া সুদ আরোপ করিয়াছে তাহা পরিশোধকরত ব্যবসায়কে সামনে আগাইয়া লওয়া কোনোভাবেই একজন ব্যবসায়ীর দ্বারা সম্ভব নহে। বিশ্বের উন্নত কোনো দেশেই এতটা চড়া সুদের কথা কেহ কল্পনাও করিতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের, যুক্তরাজ্যের কোথাও বাণিজ্যিক বা যে কোনো ধরনের ব্যাংকঋণ সুদের হার ৪.৯ শতাংশের বেশি নহে। তাহাও অতিরিক্ত বলিয়া অভিযোগ আছে। সেইখানে অর্থমন্ত্রী চেষ্টা করিয়াও আমাদের দেশে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে, অর্থাত্ ৯ শতাংশে নামাইতে পারিতেছেন না। তাহার উপর রহিয়াছে কম্পাউন্ড ইন্টারেস্ট বা চক্রবৃদ্ধি সুদের অভিশাপ। ফলে কিছু সত্যিকার ব্যবসায়ীও খেলাপিতে পরিণত হইতে বাধ্য হইয়া থাকেন।

এই যে অর্থমন্ত্রী যেইভাবে চাহিতেছেন তাহা পারিতেছেন না, ইহার পিছনে আরো বেশ কিছু কারণ বিদ্যমান। সরকারের বাহিরে, এমনকি সরকারের অভ্যন্তর হইতেও এমন কিছু চাপ আসিয়া পড়ে যাহার কারণে সুস্থ পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্য দিয়া দায়িত্ব সম্পন্ন করা মুশকিল হইয়া পড়ে। ইহা কেবল বাংলাদেশেই নহে, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলিরই একটি টিপিক্যাল সমস্যা। দেখা যায়, এমন কিছু ব্যক্তি থাকেন যাহারা ঋণখেলাপি হইয়াও, বিভিন্ন খাত হইতে লুটপাট করিয়াও মন্ত্রণালয়ের চাইতেও বেশি প্রভাবশালী হইয়া থাকেন।  মন্ত্রীর ইচ্ছা থাকিলেও অ্যাকশন লইবার উপায় থাকে না।

এই ধরনের সমস্যা হইতে একক ব্যক্তির বাহির হইয়া আসা সম্ভব নহে। প্রয়োজন গোটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি পালটানো এবং দেশের অর্থনীতিকে গুটিকয়েক ব্যক্তির রাজনৈতিক প্রভাব হইতে মুক্ত করা। অর্থাত্ একজন যোগ্য ও সক্ষম মানুষ ইচ্ছা করিলেই যে সফল হইবেন এমন কোনো কথা নাই। প্রয়োজন একটি অনুকূল আবহ তৈরি হওয়া। তবে এত কিছুর পরও আমরা আশা করি, মন্ত্রী তাহার যোগ্যতা ও সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করিয়া এই সকল প্রতিবন্ধকতা হইতে উত্তরণ ঘটাইবেন।