সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি) এক ব্যতিক্রমধর্মী গণশপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করিয়াছে। সেইখানে উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষ মাদক, দুর্নীতি, যৌতুক ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান লইবার শপথ গ্রহণ করিয়াছে। যেইহেতু উক্ত সামাজিক সমস্যাগুলি প্রতিরোধের উপায় হইল সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা, সেই বিবেচনায় এই অনুষ্ঠান একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে। অনুষ্ঠানে সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করায় আশা করা যায় সমাজে ইহার একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়িবে। অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও যদি ইহা মানিয়া চলে, তাহা হইলেই এই গণশপথ অনুষ্ঠান খানিকটা হইলেও সফল বলিয়া বিবেচনা করা যাইবে। বাংলাদেশ বিপুল জনগোষ্ঠীর নিম্ন-মধ্যম আয়ের একটি দেশ হওয়ায় এইখানে নানাবিধ সামাজিক সমস্যা দীর্ঘদিন ধরিয়া বিস্তার লাভ করিয়াছে; ইহার মধ্যে মাদক, দুর্নীতি, যৌতুক ও জঙ্গিবাদের সমস্যা উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক বত্সরগুলিতে দেশে মাদক সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করিয়াছে। সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি হইতে শুরু করিয়া নারী ও শিশু-কিশোররাও মাদক ব্যবসার সহিত জড়িত হইয়া পড়িতেছে। দেশ জুড়িয়া প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সহিত জড়িত। আর উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা ১৫ শতাংশ। অবৈধ মাদকদ্রব্য আমদানির জন্য প্রতি বত্সর ১০ হাজার কোটিরও বেশি টাকার মুদ্রা বিদেশে পাচার হইতেছে। এক জরিপে দেখা গিয়াছে, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ লাখ। কোনো কোনো সংস্থার মতে ৭০ লাখ। মাদক নির্মূলে সরকার কঠোর হইয়াছে; গত এক বত্সরে মাদক ব্যবসায়ের সহিত জড়িত এমন কয়েক শত ব্যক্তির ক্রসফায়ারে মৃত্যু ঘটিয়াছে, কিন্তু তাহার পরও মাদকের প্রভাব কমে নাই।
আমাদের দেশে আরেকটি সামাজিক সমস্যা হইল দুর্নীতি। দুর্নীতির কারণে একদিকে জাতীয় উন্নয়ন বিঘ্নিত হইতেছে, অপরদিকে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা হইতে বঞ্চিত হইতেছে। এককথায় দেশের উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, সুশাসন ও সার্বিকভাবে ইতিবাচক সমাজ পরিবর্তনের পথে দুর্নীতি বিশাল প্রতিবন্ধক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ (টিআইবি) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্য গবেষণা অনুযায়ী, কার্যকর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হইলে বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশের বেশি হইতে পারিত। সরকারের অনুমতি ব্যতীত সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আটক করিতে পারিবে না—এই সংক্রান্ত একটি আইন অনুমোদিত হইয়াছে। বলা বাহুল্য, ইহার ফলে অসাধু কর্মকর্তাদের পার পাইয়া যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হইবে। সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি উন্নত দেশে পরিণত হইবার লক্ষ্য স্থির করিয়াছে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাইতে হইলে আমাদের একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। পাশাপাশি সামাজিক সুস্থতা নিশ্চিত করিতে মাদক, যৌতুক ও জঙ্গিবাদমুক্ত হইতে হইবে। এই জন্য যে সামাজিক প্রতিরোধ ও সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন, তাহার অংশ হিসাবে চট্টগ্রামে আয়োজিত এই গণশপথ অনুষ্ঠান একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হইয়া থাকিবে।