চিররঞ্জন সরকার
আমাদের জীবনে আপদের কোনো শেষ নেই। একটি যায় তো আরেকটি আসে। সর্বশেষ আপদের নাম হচ্ছে করোনা ভাইরাস। এই ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ সাধারণ সর্দিজ্বরের মতোই। এটিকে বলা হচ্ছে, ২০১৯-এনকভ, অথবা ‘নভেল করোনা ভাইরাস’। পশু থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন ভাইরাস মানুষের মধ্যে সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ভাইরাসের সঙ্গে সার্স ভাইরাসের মিল আছে। ২০০৩ সালে সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম) শুরুতে ছড়িয়ে পড়েছিল বাদুড়ের মাধ্যমে এবং পড়ে তা বিড়ালজাতীয় প্রাণীর মধ্যে সংক্রমিত হয়, যা সবশেষে মানুষের মধ্যে আসে। নতুন এই করোনা ভাইরাসও শ্বাসপ্রশ্বাসকে সংক্রমিত করে।
মাসখানেক আগে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী শহর উহানে প্রথম এই ফ্লু টাইপের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে, এখানকার সি-ফুড কিংবা বন্যপ্রাণী থেকে এর উত্পত্তি। তাই ওখানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব সি-ফুড ও পশুপাখির দোকান। উত্পত্তির পর ভাইরাসটি রাজধানী বেইজিংসহ অন্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। মাসখানেকের মধ্যে প্রতিবেশী জাপান, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ম্যাকাওয়ে ছড়ায়। এখন এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বব্যাপী এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিত্সার জন্য উহান শহরে মাত্র ছয় দিনে বারো শ শয্যার একটি হাসপাতাল তৈরি করে রেকর্ড গড়েছে চীন। এটা মূলত আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে রাখার জন্য একটি হাসপাতাল, যেখানে সংক্রমণের শিকার রোগীদের পাঠানো হচ্ছে। হাসপাতালটিতে সুরক্ষা এবং জীবাণু প্রতিরোধী সরঞ্জাম রয়েছে। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সার জন্যও বেইজিংয়ে শিয়াওটাংশান হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছিল। সেটা তৈরি করা হয়েছিল সাত দিনে, যা বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত হাসপাতাল তৈরির রেকর্ড।
খুব দ্রুত জিনিসপত্র তৈরির ক্ষেত্রে চীনের রেকর্ড রয়েছে। এমনকি বিশাল বিশাল প্রকল্পও তারা রাতারাতি তৈরি করে ফেলে। চীনের রাষ্ট্রব্যবস্থা এ ধরনের প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে খুবই অনুকূল। এই দেশটিতে সাধারণত ওপর থেকে নিচে বা টপ-ডাউন মোবিলাইজেশন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়ে থাকে। যার কারণে তারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তাদের যে কোনো উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারে।
এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে চীন বিস্ময়কর উন্নতি করেছে। তারা তৈরি করতে পারে না—এমন কোনো জিনিস দুনিয়ায় নেই। এ ব্যাপারে বাজারে বিভিন্ন রকম গল্প চালু আছে। তেমনই একটা গল্প উল্লেখ করা যাক।
একবার এক মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী ও গবেষক দিন কয়েকের জন্য সফরে চীনে গেলেন। সেখান থেকে ফেরার পর নিউ ইয়র্কের গবেষণাগারে ঢোকার পথে সিকিউরিটির বাধার মুখে পড়লেন সেই বিজ্ঞানী।
—কী ব্যাপার?
—আপনার শরীরের বায়ো-মেকানিক পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হবে।
—মানে কী! আমার পরীক্ষা কেন করতে হবে?
—আলবত্ করতে হবে, কারণ আপনি চীন থেকে এসেছেন। ওরা আপনাকেই পাঠিয়েছে, নাকি আপনার একটা কপি পাঠিয়ে দিয়েছে; সেটা যাচাই করে দেখতে হবে!
হ্যাঁ, এই সন্দেহ অমূলক নয়। চীনা প্রকৌশলীরা মিসাইল থেকে শুরু করে মোবাইল, জাহাজ থেকে শুরু করে মশার কয়েল যে ‘কপি’ করে ফেলছে; তাতে সন্দেহ নেই। মোবাইলের কথাই ধরুন। মোবাইলের বাজারে একচেটিয়া বাণিজ্য করছিল ফিনল্যান্ডের নকিয়া, কোরিয়ার স্যামসাং, জার্মানির সিমেন্স।
চায়না মোবাইল মার্কেটে ঢুকে নকল মোবাইল তৈরির মাধ্যমে। হেন কোনো মোবাইল নেই, যা তারা নকল করেনি। সে সময় মোবাইল ক্রেতাদের কাছে একটা আতঙ্কের নাম ছিল ‘চায়না’। সবাই কেনার আগে নিশ্চিত হতে চাইত—‘মালটা চায়নার না তো?’
সে সময় একটা কৌতুক প্রচলিত ছিল, কীভাবে নিশ্চিত হবেন, আপনার সেলফোনটি মেড ইন চায়না কি না?
লক্ষণ ১ : পাঁচ মিনিটেই চার্জ ফুল দেখাবে। ছয় মিনিটে চার্জ এম্পটি।
লক্ষণ ২ : ফোনে টিভি দেখা, রেডিও শোনা থেকে শুরু করে নেইলকাটার, গ্যাসলাইটার, কান খোঁচানি, পিঠ চুলকানি সবকিছুর সুবিধা আছে।
লক্ষণ ৩ : টুথপিক, কটনবাড দিয়েও মেসেজ লেখা যাবে।
লক্ষণ ৪ : কিছু স্পেলিং মিসটেক থাকবেই। যেমন : NokLa, blackderry, i-porn, samswag etc.
লক্ষণ ৫ : একটা প্লেন উড়ে গেলে, মোবাইল শো করবে : one missed call.
লক্ষণ ৬ : রাস্তা দিয়ে ট্রাক গেলে, মোবাইল শো করবে : charger connected.
লক্ষণ ৭ : আপনার পাশ দিয়ে যদি কোনো চাইনিজ হেঁটে যায়, মোবাইল শো করবে : one Bluetooth device found!
তবে চীনের যন্ত্রপাতি নিয়ে হাসি-ঠাট্টার সেই দিন আর নেই। এখন বিশ্বের বাঘা বাঘা ইলেকট্রনিকস ডিভাইস প্রস্তুতকারকদের সকল পণ্য তৈরি হচ্ছে চীনে। আলপিন থেকে ফোর্থ জেনারেশন জঙ্গিবিমান সব বানাচ্ছে চীন। আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স তৈরির ক্ষেত্রেও চীন এগিয়ে। এর বাজার এবং পেটেন্ড নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে বিরোধ তুঙ্গে। অথচ একসময় চীনের অবস্থা আমাদের চেয়েও খারাপ ছিল। মাও-সে-তুংয়ের আমলে চীনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মাও টেলিগ্রাম পাঠালেন রাশিয়ার ক্রুশ্চেভকে :চীনে দুর্ভিক্ষ। দয়া করে খাদ্যদ্রব্য পাঠান।
ক্রুশ্চেভ উত্তর দিলেন : আমাদের নিজেদের অবস্থাও রীতিমতো সংকটজনক। তাই কোনো খাদ্যদ্রব্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। পেটে পাথর বাঁধুন।
মাওয়ের ফিরতি টেলিগ্রাম : জরুরি ভিত্তিতে তাহলে কিছু পাথর পাঠান!
দুর্ভিক্ষে পেটে পাথর বাঁধার জন্য একসময় যে চীনের পাথরও ছিল না সেই চীন এখন কয়েক দশকের ব্যবধানে গ্রেট ওয়ালের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেট ওয়ালেটেরও মালিক। আমেরিকার ডিজনি স্টোর থেকে শুরু করে আমাদের অজপাড়াগাঁয়ের ফেকু মিয়ার মুদির দোকান সব জায়গায় চীনের তৈরি পণ্যে ঠাসা।
চীনের শিল্পে উন্নতির ঘটনা বেশি দিন আগের নয়। প্রথম দিকে নকলসামগ্রী উত্পাদনকারী চীনের শিল্পনগরী তাঞ্জিন আর আমাদের জিঞ্জিরার উত্থান প্রায় একই সময়ে। আটের দশকে বাজারে প্রচুর জাপানি নকল ন্যাশনাল প্যানাসনিক, সনি টেপরেকর্ডার, ক্যামেরা, চার্জ লাইট, চার্জার ফ্যান আর রেডিও পাওয়া যেত, যা ছিল জিঞ্জিরার তৈরি।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাঞ্জিনের শিল্পবিপ্লবের সুফল পৌঁছে গেছে চীনের ঘরে ঘরে। চীনা পণ্য ‘মেড ইন চায়না’ অথবা ‘মেড বাই চায়না’ সিলে গোটা পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ আমাদের নাক সিটকানো স্বভাব আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আজ আমাদের জিঞ্জিরার সেই ঐতিহ্য আর অস্তিত্বই বিলীন।
বর্তমান সভ্যতা যেন চীনের সাফল্য আর আমাদের ব্যর্থতার গল্পের ইতিহাস! করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের চিকিত্সায় ছয় দিনে হাসপাতাল তৈরির কথাই ভাবুন। আমাদের দেশে তেমন কোনো হাসপাতাল বানানোর প্রয়োজন দেখা দিলে প্রথমেই একনেকে অনুমোদন পেতে তিন মাস চলে যেত। এরপর কাজ শুরু হওয়ার আগে নতুন হাসপাতালের সম্ভাব্য ডিজাইন দেখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ১৭ সদস্যের বিশেষ টিম যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স মেডিক্যাল স্কুল অ্যান্ড হসপিটাল দেখতে যেত ১৫ দিনের জন্য। তারপর দেশে ফিরে আস্তে-ধীরে একটা চিপা ছয়তলা হাসপাতাল ভবনের নকশ জমা দিত। এরপর দুর্নীতির অভিযোগে একাধিকবার টেন্ডার বাতিল হতো। ঢিমে তালে হাসপাতাল বানানোর পর এর সরঞ্জাম কেনা নিয়ে শুরু হয়ে যেত হুলুস্থুল কাণ্ড। ঝাড়ুর দাম ধরা হতো ১৭ হাজার টাকা, বালিশের দাম ধরা হতো ১৬ হাজার টাকা, পর্দার দাম হতো ৪১ হাজার টাকা, সিলিং ফ্যানের দাম হতো ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা।
এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে শুরু হয়ে যেত রাজনৈতিক বাদানুবাদ। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিতেন, এই সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে চীন থেকে ভারত হয়ে এই ভাইরাস দেশে এসেছে। ভারতের তাঁবেদার এই সরকার তিস্তার পানি আনতে পারে না, কিন্তু ভাইরাস ঠিকই এনেছে। ওবায়দুল কাদের সাহেব ঘোষণা দিতেন, একজন লন্ডনে বসে স্কাইপেতে এই ভাইরাস সাপ্লাই দিচ্ছেন। এটা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু তারা ষড়যন্ত্র করে এই সরকারের কিছুই করতে পারবে না। সরকারের গাফিলতির প্রতিবাদে বাম দলগুলো ২৭ জনের জমায়েত নিয়ে বিশাল এক ব্যানারসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিয়ে পুলিশের প্যাদানি খেয়ে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করার হুমকি দিতেন।
এদিকে দোকানদাররা মাস্ক স্টক করে ফেলত। ১০ টাকার মাস্ক ৫০০ টাকায় বিক্রি হতো। ফেসবুকাররা দাবি তুলত, পদ্মা সেতু চাই না। মেডিসিন চাই। ভ্যাকসিন চাই। আর্তমানবতার সেবায় কেউ কেউ স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিরও আয়োজন করতেন।
আর দেশের ধর্মবাদীরা মাইকে জোর গলায় ঘোষণা দিত যে, চীনদেশের মানুষ নামাজ-কালাম-পর্দা করে না বলে ওখানে আল্লাহর গজব নাজেল হয়েছে। আর মেয়েমানুষ জিনসের প্যান্ট এবং গেঞ্জি পরে বলে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। বোরকা আর হিজাব পরলে এই ভাইরাস ছড়াত না।
এদিকে সরকারের মন্ত্রীরা ‘মিডিয়া আতঙ্ক ছড়াচ্ছে’ বলে সব দায় মিডিয়ার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতেন। ‘সবকিছু সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে’ বলে ঘন ঘন বিবৃতি দিতেন।
এইসব তাল-বাহানা-তামাশা করতে করতেই পরের ইলেকশন চলে আসত। আর পরের ইলেকশনে এই ইস্যুর চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে এসে পুরোনো সব ইস্যুকে বুড়িগঙ্গার নোংরা জলে ভাসিয়ে নিয়ে যেত!
n লেখক :রম্যরচয়িতা