সংগ্রহ ও সংরক্ষণে প্রযুক্তির অভাবে ২৫ ভাগ ফল নষ্ট

ফল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, কৃষকের অদক্ষতা ও পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে দেশে প্রতি বছর উত্পাদিত ফলের ২৫ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক ও বাগানিরা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে ফলের উত্পাদন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাড়ছে ফল চাষের জমির পরিমাণও। অনেকেই বেশি লাভের আশায় প্রচলিত শস্য বাদ দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ফল চাষ করছেন। এছাড়া বাড়ির আঙিনা ও সড়কের পাশে ফলগাছ রোপণ দিন দিন বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে ৭০ প্রজাতির বেশি ফল চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদিত হচ্ছে ৪৫ প্রজাতির ফল। মোট উত্পাদিত ফলের ৫৩ শতাংশ বাণিজ্যিক বাগান থেকে আসে। আর বসতভিটা ও তত্সংলগ্ন এলাকা থেকে আসে বাকি ৪৭ শতাংশ ফলের জোগান। দেশে বর্তমানে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, কলা, কুল, পেঁপে, আনারস ছাড়াও ড্রাগন, রাম্বুটান, স্ট্রবেরি, মালটাসহ বিভিন্ন বিদেশি ফল চাষ হচ্ছে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে ফল উত্পাদিত হয় ৯৯ লাখ ৭২ হাজার টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৬ হাজার টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ কোটি ১০ লাখ টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ কোটি ২০ লাখ ৯৬ হাজার টন ও ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ১ কোটি ২১ লাখ ১৩ হাজার টন ফল উত্পাদিত হয়। উত্পাদিত উল্লেখযোগ্য ফলের মধ্যে আম ২৩ লাখ ৭২ হাজার ২১৬ টন, কাঁঠাল  ১৭ লাখ ২৭ হাজার ৬০৪ টন,  লিচু ২ লাখ ২৪ হাজার ২১১ টন, কলা ১৮ লাখ ৮৮ হাজার টন, পেঁপে ৮ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৫ টন, পেয়ারা ৫ লাখ ৬ হাজার ৪৭৮ টন, কুল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৬১ টন, নারিকেল ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৮৫১ টন, জাম ৯৯ হাজার ৬২৯ টন ও আনারস ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৫৮৩ টন উত্পাদিত হয়।

গত ছয় বছরের ব্যবধানে ফল উত্পাদন বেড়েছে প্রায় ২২ লাখ টন। এদিকে উত্পাদনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপচয়ের পরিমাণও। গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যেখানে ফল অপচয় হয় ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টন। সেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অপচয় হয় ৩০ লাখ ২৮ হাজার টন। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ব্যাপক পরিমাণ ফলের এই অপচয় রোধ করতে পারলে একদিকে যেমন কৃষক ও বাগানিরা উপকৃত হবে তেমনি ভোক্তারা কম দামে ফল খেতে পারবে। শুধু তাই নয়, বিদেশ থেকে ফল আমদানির পরিমাণও কমবে।              বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪১ কোটি টাকার ফল আমদানি করা হয়। গত পাঁচ অর্থবছরে শুধু আপেল, কমলা, মালটা ও আঙুর আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ফলের উত্পাদনের হার বাড়ছে। তবে সঠিক নিয়ম না জানায় ফল সংগ্রহের সময়ই উত্পাদনের একটি বড়ো অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, নিয়ম মেনে ফল সংগ্রহ করলে ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এছাড়া ফল পাকানোর ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের স্বাস্থ্যবান্ধব পদ্ধতি অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন কৃষিবিদরা। এজন্য বাগানিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে ফল নষ্টের পরিমাণ কমবে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের ফল সংগ্রহ প্রযুক্তি খুবই দুর্বল। এছাড়া পরিবহন, স্টোরেজেও প্রচুর ফল নষ্ট হয়। তিনি বলেন, সরকার আমাদের সবসময় বলেছে, উত্পাদন বাড়াও। আমরা এখন উত্পাদন বাড়াচ্ছি। প্রতি বছরই দেশে সব ধরনের ফসলেরই উত্পাদন বাড়ছে। কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের ব্যবস্থাপনা কি বেড়েছে? আমাদের এখন সারপ্লাস ম্যানেজমেন্টে বিনিয়োগ করতে হবে। কৃষকদের ফল সংগ্রহ, সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ফলের জন্য আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা, স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে  তুলতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উত্পাদিত ফলের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ নষ্ট হতে পারে। এর বেশি কোনভাবেই হতে পারে না। এখন সময় হয়েছে, এ বিষয়ে নজর দেওয়ার।